গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে ছোট-বড় মিলাইয়া বেশকিছু অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গিয়াছে। তন্মধ্যে কয়েকদিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের দুইটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে লালবাগের পশ্চিম ইসলামবাগে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ পুড়িয়া গিয়াছে ১৬টি ছোট প্লাস্টিক কারখানা এবং ২০টির মতো গুদাম। ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কীভাবে আগুন লাগিয়াছে তাহা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও ঘিঞ্জি ওই স্থানটিতে যেভাবে জনবসতির মধ্যে গাদাগাদি করিয়া মারাত্মক দাহ্য সামগ্রীর কারখানা ও গুদাম গড়িয়া উঠিয়াছে—তাহাতে আতঙ্কিত না হইয়া উপায় নাই। অধিকাংশ বাড়ির নিচে কারখানা, গুদাম আর উপরে টিনশেড ঘরে লোকজনের বসবাস। ভাগ্যক্রমে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটিলেও আগুনে সেখানকার বেশকিছু বাসাবাড়িও ভস্মীভূত হইয়াছে। সংকীর্ণ গলি এবং অপরিকল্পিত কারখানা ও জনবসতির কারণে অগ্নিনির্বাপণেও গলদঘর্ম হইতে হইয়াছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। রাজধানীর অন্যসব এলাকার চিত্রও যে ভিন্ন নহে—তাহাও সুবিদিত। ইহার পাঁচদিন আগে পল্টনে একটি বহুতল ভবনের ৯ তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছুটির দিনে সংঘটিত এই অগ্নিকাণ্ডটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করিলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নিষ্ঠা ও দক্ষতার কারণে ভবনটিতে আটকাপড়া সকলকেই নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হইয়াছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হইতে আগুনের সূত্রপাত বলিয়া প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মহাপরিচালক বলিয়াছেন যে, ভবনটির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ভালো নহে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নূতন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত সফলভাবে তাহাদের সামর্থ্য প্রমাণ করিতে সক্ষম হইলেও বহুতল ভবনগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যে এখনো ঝুঁকিমুক্ত নহে—এই ঘটনায় তাহা আবারও প্রমাণিত হইল।
আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতেছে। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই ঘটিয়াছে আরও কমপক্ষে তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ইহা সত্য যে, শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইনস্টিটিউটের সহিত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের ভাষ্য হইল, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা এখন বেশি এবং তাহা ক্রমবর্ধমান। আর বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ডই হইল অসচেতনতাজনিত। ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন কিংবা বিদ্যুতের লাইন এই ধরনের দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হইলেও এইদিকে ভুক্তভোগীদের মনোযোগের অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলে দুর্ঘটনা অনিবার্য হইয়া ওঠে। সম্প্রতি তাহাতে যুক্ত হইয়াছে আরও একটি নূতন ধরনের বিপদ। আগুন জ্বালাইয়া শীত নিবারণ করিতে গিয়া উত্তরাঞ্চলে গত তিনদিনে দগ্ধ হইয়া মারা গিয়াছেন দুইজন। সেইসঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালগুলিতে উদ্বেগজনক হারে বাড়িতেছে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা। অথচ একটু সাবধান হইলেই এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল, রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলীতে এতগুলি প্রাণ জীবন্ত দগ্ধ হইবার পরও যে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের বোধোদয় হয় নাই লালবাগের অগ্নিকাণ্ড যেন তাহাই স্মরণ করাইয়া দিল।