কৌশলপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশটাকে মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি অনেক ষড়যন্ত্রের আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকেই বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। সেই সাথে দেশবাসীর প্রত্যাশা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন তিনি। আজ নতুন সরকারের মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করছেন। একটানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও তাদের কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়া অনেক।
আসলে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের সুসন্তানরা স্বাধীনতা-বিরোধীদের তৈরি বিকৃত ইতিহাস দলিত-মথিত করে স্বাধীনতার চেতনাকে বুকে ধারণ করে দেশের জন্য নতুন ইতিহাস তৈরি করে দিয়েছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরকেই অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে যারা জনমানুষের কল্যাণ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে, উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়, বিশ্ব-মানচিত্রে দেশকে মর্যাদাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আপন স্বার্থের বদলে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাস্তব পদক্ষেপ নেয় ও যন্ত্রণার বেড়াজাল থেকে নারীদের বের করে এনে উন্নয়নের ধারার সাথে সম্পৃক্ত করে। তারা জেনেশুনে তাদেরকেই নির্বাচিত করেছেন যারা দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করার দৃপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, বজ্রকঠিন প্রত্যয় নিয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়ে যায়, মঙ্গা ও দারিদ্র্য থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর লক্ষ্যে কৃষি-শিল্পের উন্নয়ন ঘটায়, নানামুখী প্রকল্প নিয়ে নাগরিকদের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয় এবং সর্বোপরি, এক’শ বছরের পরের বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্ন দেখায়।
তৃণমূল থেকে সর্বত্র সমর্থনপুষ্ট আওয়ামী লীগকে জয়ের মালা উপহার দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে, দেশবাসী সব সময়ই উন্নয়ন আর শান্তির পক্ষে। তারা চায় নির্বিঘ্নে উন্নয়ন হোক, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিনা বাধায় চলতে থাকুক, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক, শিক্ষার পরিবেশ নির্বিঘ্ন থাকুক আর দেশের মর্যাদা আকাশছোঁয়া হোক। ভোটাররা এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে জনগণের শান্তি বিনষ্ট করলে, বিনা কারণে জনজীবনে যন্ত্রণা সৃষ্টি করলে, দেশবিরোধীদের জেনেশুনে প্রশ্রয় দিলে, নিবন্ধন বাতিল হওয়া দলের অনুসারী স্বাধীনতা বিরোধীদের নিজের কোলে আশ্রয় দিয়ে তাদের দুষ্কর্মকে জায়েজ করার অপচেষ্টা করলে, পথহারা ক্ষমতালোভীদের নিয়ে ঐক্য করলে আর স্বাধীনতা উপহার দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলা-অসম্মান করলে কিংবা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা করলে, তা দেশের সচেতন মানুষ কখনও মেনে নেয় না।
বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্রনায়কের সুপরিচালনার দীপ্তি নব প্রজন্মের প্রত্যাশার মনময়ূরির পাখনায় স্বপ্নের রঙ ছড়িয়েছে; তাদের প্রত্যাশা হয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত। তবে নতুন সরকারের চলার পথটিতে চ্যালেঞ্জ অনেক। বহুমুখী চ্যালেঞ্জকে কবুল করেই সরকারকে এবং সরকার গঠনকারী দলটিকে এগিয়ে যেতে হবে সদম্ভে নয়, বিনয়ের সাথে, নির্ভয়ে কর্মের সাথে, প্রজ্ঞা-বিচক্ষণতার সাথে আর জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত করে। সবার এতো এতো প্রত্যাশা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। কারণ এ দলটিই সরকার গঠন করে বিগত দশ বছরে দেশকে দিয়েছে অনেক কিছু, যা প্রত্যাশার বাইরে ছিল অনেকের। এখন সবার চাওয়া হলো ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সফল বাস্তবায়ন। জোর দিতে হবে সুশাসনের উপর। কঠোর হস্তে দমন করতে হবে সন্ত্রাস, রাহাজানি আর মাদকের আগ্রাসন। জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে। প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা জরুরি। একই সাথে শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে দলের নাম ভাঙিয়ে সুযোগ নেওয়ার জন্য উন্মুখ সুবিধাবাদীদের ব্যপারে যারা দুর্বৃত্তায়নের কণ্টকে দলকে/সরকারকে কণ্টকিত করে এবং জনগণের ভরসায় চিড় ধরায়। মূল্যায়ন করতে হবে দলের ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃত কর্মীদের অবদানকে এবং সচেতনভাবে সুযোগ দিতে হবে তাদেরকে নিজ নিজ অঙ্গনে ভালো কাজ করার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। জনগণের মন থেকে ভয়-আতঙ্ক দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে (বিগত নির্বাচনে ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের রাজনীতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে জনগণ)। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে সর্বত্র মানুষ চায় শান্তির সুবাতাস সৃষ্টি হোক, সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে দরজা খোলা ঘরে ঘুমাতে পারুক, উঠতি বয়সের মেয়েটি নির্ভয়ে-নির্ঝঞ্ঝাটে স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়া করুক, শহরে-গ্রামে সর্বত্র বখাটেপনা চিরতরে নির্মূল হোক, মাদকের ছোবল থেকে ছেলে-মেয়েরা দূরে থাকুক, নারী নির্যাতন দূর হোক, নারীকে যথাযথ সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি সৃষ্টি হোক, পরিবহনে নারী-নিগ্রহের অবসান হোক এবং শহরে-নগরে রাষ্ট্রীয় খরচে নারী-বান্ধব পরিবহনের ব্যবস্থা করা হোক।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক যেসব ক্ষেত্রে আমরা এখনও বিশ্বমান অর্জন করতে পারিনি সেসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়নও জরুরি। এখন আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা অর্জন, সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট-এর জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা, অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও পথশিশুদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সকল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে নিয়ে এসে খাদ্য-চিকিত্সা-শিক্ষাসহ ভরণপোষণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও প্রতি পরিবারে একজন বেকারের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র-কুটির শিল্পসহ বিভিন্নমুখী সেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। এছাড়া সাধারণ কলেজগুলোকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে শিক্ষকদেরকে টেকনিক্যাল শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করা, শিক্ষায় বরাদ্দ অন্তত তিনগুণ বৃদ্ধি করে শিক্ষাকে সময়োপযোগী ধারায় নিয়ে আসা, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী গ্রাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যে মাতৃভাষা চর্চার পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি করা, মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে মূলধারার সমতুল্য করে বিপুল জনসম্পদের অপচয় রোধ করা, শুধু শিক্ষক (সর্বস্তরের) তৈরির লক্ষ্যে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও গবেষণার কালচার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে একাধিক ‘গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। দরকার জাতীয় ইনকিউবেশন সেন্টার তৈরি করে নবীন গবেষকদের সম্পৃৃক্ত করে তাদের আবিষ্কারকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া এবং সর্বোপরি, শিক্ষার জন্য বিশ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি করে শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা।
বিগত সময়ের অভূতপূর্ব উন্নয়ন-কর্মকাণ্ড দেশবাসীকে (বিশেষ করে নগরবাসীকে) আরও বেশি স্বাপ্নিক করে তুলেছে। নির্বাচনের পর তারা স্বপ্ন দেখছে তাদের পছন্দের সরকার আগামী বছরগুলোতে কঠারহস্তে যাতায়াত ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে, যানজটের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেবে, বহুমুখী দূষণের শিকার রাজধানী শহরকে দূষণের অত্যাচার (শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, আলোদূষণ, পরিবেশদূষণ) থেকে মুক্ত করবে, বর্ষায় জলজট থেকে মুক্তি দেবে, রাস্তায় রংচটা ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল নিষিদ্ধকরাসহ রাস্তার পাশে ঝুলায়মান ‘নেতামন্ডিত’ দৃষ্টিকটু পোস্টার/ব্যানার নিষিদ্ধ করে নগরবাসীকে দৃষ্টিদূষণের হাত থেকে রক্ষা করবে, শহরের আশপাশের নদীগুলোকে নদীখেকোদের গ্রাস থেকে র্িছনিয়ে নিয়ে বাঁচার সুযোগ করে দেবে, রাস্তাঘাট-অলিগলি থেকে দলমত নির্বিশেষে ছিনতাইকারী-মাস্তানদের নির্মূল করবে এবং মহল্লায় মহল্লায় দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
নাগরিকরা আরও আশা করে, সরকার সামষ্টিক বিষয়ের পাশাপাশি ব্যষ্টিক বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিবে। ব্যষ্টিক বিষয়গুলো মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করে এবং জনগণ এগুলোকেই বেশি মূল্যায়ন করে। সামষ্টিক উন্নতি মানুষকে সামগ্রিকভাবে তৃপ্ত করে আর ব্যষ্টিক পর্যায়ের শান্তি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই এ পর্যায়ের তৃপ্তি জনগণের সাথে সরকারের নৈকট্য বৃদ্ধি করে। নবনিযুক্ত সাংসদরা যদি এ বিষয়টির প্রতি সমধিক গুরুত্ব দেন, তাহলে সেটি হবে সাধারণ মানুষের অধিকতর নিকটবর্তী হওয়ার সফল পদক্ষেপ। ব্যক্তি পর্যায়ের তৃপ্তি সামষ্টিক উন্নয়নের ফল ভোগ করার মতো মন তৈরি করে দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত এরূপ ‘মন’ তৈরি করে দেওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সামষ্টিক ‘ভালো’কে মানুষ তুচ্ছ মনে করে। তাই এলাকাভিত্তিক সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়া সরকার তথা নবীন সাংসদদের কাছে অধিকতর কাম্য। এমনটি হলেই বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছবে অনায়াসে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকারের হাত ধরে গড়ে উঠবে এমন এক সুন্দর আলোকিত মর্যাদাবান বাংলাদেশ যা বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়ে থাকবে শির উঁচু করে।
n লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়