ফেসবুক আসক্তির বিপদ

আমাদের দেশকে বলা হয়, অপার সম্ভাবনার দেশ। এটা কিন্তু এমনি এমনি বলা হয় না। এর পেছনে রয়েছে কিছু কারণ। তার মধ্যে একটা কারণ হলো, আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই কর্মক্ষম। ২০১৬ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ! অর্থাত্ মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ। উন্নত অনেক দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট সংখ্যার অর্ধেকেরও কম। তাই কর্মক্ষম জনসংখ্যা আমাদের জন্য ‘প্লাস পয়েন্ট’।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি আমাদের এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে অলস করে তুলছে। এর ফলে ঝুঁকি বাড়ছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের ওপর। কমছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। যার প্রভাব আমাদের অর্থনীতির ওপরেও পড়ছে। বিশ্বের প্রায় দুশ’ কোটি তরুণ-তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো ফেসবুক। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। যার সিংহভাগই তরুণ-তরুণী, অর্থাত্ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে তো বটেই, উন্নত দেশগুলোতেও মাথা ব্যথার বড় কারণ এখন ফেসবুক। গত বছরে মার্চ মাসে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উঠে আসে, যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ভার্চুয়াল জগতে (ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) ব্যয় করে তাদের মধ্যে দেখা যায় প্রবল একাকীত্ব! প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ভার্চুয়াল জগতে যারা যত বেশি সময় কাটায়, তাদের নিঃসঙ্গতা তত বেশি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে দ্য সানের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, ভার্চুয়াল জগতে আসক্তি ও মাদকাসক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই! গবেষণায় উঠে এসেছে, ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কের প্যাটার্ন আর মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কের প্যাটার্ন পুরোপুরি এক। গবেষকরা দেখেছেন, ফেসবুকে কোনো ছবি পোস্ট করার সেই ছবিতে লাইক পাওয়ার আগ্রহ মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিঃসরণ করে। মাদক গ্রহণের সময় মস্তিষ্কে একই ধরনের হরমোন নিঃসরিত হয়! ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট ডগলাস জেনটাইল বলেন, ‘ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত ব্যক্তি বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে!’ শুধু প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণী নয়, ঝুঁকিতে আছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু-কিশোরেরাও। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফ রিপোর্ট বলছে, বর্তমান বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু! গত বছর নভেম্বর মাসে হিন্দুস্থান টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরীরা পাঁচ ঘণ্টারও অধিক সময় ভার্চুয়াল জগতে ব্যয় করে, তাদের ৪৮ শতাংশ একবার হলেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে! সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভার্চুয়াল জগতে আসক্তির ফলে শিশু-কিশোর-তরুণ-যুবক-বৃদ্ধদের মনোদৈহিক সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ‘ফেসবুক’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘মি-টু’র মতো বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ফেসবুক। পেশাগত, শিক্ষাগতসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের ফেসবুক ব্যবহার করতে হয়। তাই ফেসবুক পুরোপুরি বন্ধ করা আমাদের অনেকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহার করতে হবে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে এবং ব্যবহারের স্থায়িত্বকাল হবে খুবই স্বল্প। নিজে ফেসবুকে আসক্ত হওয়া যাবে না। পরিচিত কেউ যাতে ফেসবুকে আসক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়