কৃষিঋণ বিতরণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। গতবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ঋণ বিতরণ। আর অধিকাংশই ব্যাংকই এ সময়ে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণেও ব্যর্থ হয়েছে। এ খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। মূলত এ খাতে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহের কারণে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর কৃষকের কাছে যাওয়ার চেয়ে কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ের আগ্রহ দেখায় বেশি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কৃষি ঋণে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনামূলক নজর কম। সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮ শতাংশ ঋণ কৃষিতে, সেখানে বেসরকারি ব্যাংকের ২ শতাংশের কম। আবার কৃষি খাতের ঋণে বৈচিত্র্য নেই বলেও দেখা গেছে। কৃষি ঋণের ৫৯ শতাংশই যায় শষ্য উত্পাদনে। আর প্রাণিসম্পদ এবং পোল্ট্রি ১০ শতাংশ, মেস্য ৯ শতাংশ, দারিদ্র্য বিমোচনে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র এক শতাংশ ঋণ। আর শষ্য গুদামজাতকরণে এ হার শূন্যের কোটায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য ছোট ঋণে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হওয়ার কথা বলে ব্যাংকগুলো সাধারণত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ নিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যবাধকতার কারণে কৃষি ঋণে ৯ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও যেসব ব্যাংক এনজিওর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করে সে ক্ষেত্রে কৃষি ঋণের সুদহার অনেক বেশি হয়ে যায়। এসব কারণে সবসময়ই এ খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো অনীহা দেখিয়ে থাকে। অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় সরকারের তাগিদ থাকলেও কৃষকরা ঋণ চেয়ে ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণের সুদহারও অনেক বেশি নেয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জুলাই-নভেম্বর পাঁচমাসে কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ৭ হাজার ৪৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৭৫৫ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮ হাজার ২৩০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। যা গত বছরের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালের একই সময়ে কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ ছিলো ৫ হাজার ৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ছয়টি ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণ শুরুই করেনি। ৭ বাণিজ্যিক ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণ শুরু করলেও বিতরণের হার এক বা দুই শতাংশ। যেসব ব্যাংক এখনো কৃষিঋণ বিতরণ শুরুই করেনি, সেসব ব্যাংক হলো— বিদেশি মালিকানার সিটি ব্যাংক-এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং উরি ব্যাংক। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের মধুমতি ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক।
এদিকে ঋণ বিতরণ কমলেও আদায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ খাত থেকে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত নভেম্বর শেষে কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৯ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২ শতাংশ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করার কথা। পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র্য দূরীকরণে বিভিন্ন প্রকার কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণও কৃষিঋণের আওতাভুক্ত। তথ্য অনুযায়ী অন্যান্য ঋণের পাশাপাশি অনুপাতিক হারে কৃষি ঋণ বিতরণ করা বাধ্যতামূলক। যেসব ব্যাংকের পল্লী অঞ্চলে শাখা নেই সেসব বাণিজ্যিক ব্যাংককেও এনজিও লিংকেজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে কৃষিঋণ বিতরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুদ হার নির্ধারিত আছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) নির্ধারিত ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে নির্ধারণে যে সুদ হার সেই হার। সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের এই এ কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান হারে কৃষিঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে হিসাবে গতবছর বিতরণ করা ঋণের সাথে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা যোগ করে ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।