সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়নে ব্যর্থতা কেন?

সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র মূলত কাঠামোবদ্ধ। মূল পাঠ্যবইয়ের যেই সকল বিষয় রহিয়াছে, সেইখান হইতে সকল প্রশ্ন না করিয়া তাহারই মূলভাবের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা—এই চারটি ধাপে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদরা ইহার প্রয়োগকালে ইহার নাম দিয়াছেন সৃজনশীল পদ্ধতি। ইহার প্রকৃত অর্থ পরীক্ষার প্রশ্নগুলি একটা কাঠামো বা স্ট্রাকচারের মধ্যে করা হইবে, যাহা মূলত ওই চারটি ধাপকে নির্দেশ করিয়া থাকে। বেঞ্জামিন ব্লুম নামক এক শিক্ষাবিদের বিশ্লেষণকে ভিত্তি করিয়া এই পদ্ধতি গড়িয়া উঠিয়াছে, সারা পৃথিবীর ছাত্র-ছাত্রীদেরই এই পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়। আমাদের দেশে ইহা ২০০৮ সাল হইতে কার্যকর হইয়াছে। তবে অভিযোগ রহিয়াছে যেই সকল শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করিবেন তাহাদেরই সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নাই।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুসারে, চালু হইবার ১০ বত্সর পরেও সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করিতে পারিতেছেন না ৪৩ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। চলতি বত্সরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪ হাজার ৮০১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করিয়াছে মাউশির একাডেমিক সুপারভিশন দল। পরিদর্শনের ভিত্তিতে তাহারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাহাতে দেখা যায় সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরিতে সক্ষম ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাকি ৪৩ শতাংশ শিক্ষক এই পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করিতে পারিতেছেন না। কোনো কোনো শিক্ষক অবশ্য এই অদক্ষতার জন্য শিক্ষকদের অদক্ষতা নহে, বরং পাঠদানে অতিরিক্ত চাপকেই দায়ী করিয়াছেন। সরকার অবশ্য ইতোমধ্যে এক হাজার ৬৯২ জনকে ১২ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে মাস্টার ট্রেইনার পুল প্রস্তুত করিয়াছে। আরো এক লক্ষ ৬০ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রহিয়াছে।

পদ্ধতি হিসাবে কিছুটা জটিল হওয়ায় এবং প্রশ্ন করিতে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করিবার বাধ্যবাধকতা থাকায়, সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের জন্য শিক্ষকরাই গাইড বইয়ের উপর নির্ভর করিতেছেন। ফলে শিক্ষার্থীদেরও গাইড বইয়ের প্রতি নির্ভরশীলতা দিনদিন বাড়িয়া যাইতেছে। বাংলার মতো বিষয় কখনোই কেহ প্রাইভেটে পড়িত না বা কোচিং-এ যাইত না। তথাকথিত সৃজনশীল পদ্ধতির জটিলতায় পড়িয়া শিক্ষার্থীদের আজকাল বাংলাও কোচিং সেন্টারে গিয়া পড়িতে হইতেছে। একদিকে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নাই। স্থানীয় পর্যায়ে তদবির ও ঘুষের মাধ্যমে অযোগ্য লোকজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হইতেছেন। শিক্ষক হিসাবে তাহাদের ঘাটতি হয়ত প্রশিক্ষণ দিয়া পূরণ করা যায়। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তনের পর খুব কম শিক্ষককেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হইয়াছে। শিক্ষাপদ্ধতি লইয়া যেহেতু বারংবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিবার অবকাশ নাই, তাই সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে শিক্ষকদের দক্ষ করিয়া তুলিতে হইবে এবং এইজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। আর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত মেধাবীরা যাহাতে সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থাগ্রহণ ও পরিবেশ প্রস্তুত করিতে হইবে। নচেত্ প্রশিক্ষণ দিয়াও ফল পাওয়া যাইবে না।