ইট ভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে মানিকগঞ্জের সদর উপজেলায় তিন ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ বা উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ভাটা মালিকরা- এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন। এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ফসলি জমির পরিমাণ ৯৮ হাজার ৫শ হেক্টর এবং ইট ভাটা রয়েছে ১২৩টি। এই ইট উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি আসছে কৃষিজমি থেকে। জানা গেছে, কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিজমির উপরের মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। দরিদ্র কৃষকরা স্বল্পমূল্যে জমির উর্বর মাটি ভাটা ও গৃহ নির্মাণকারীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে ফসল উত্পাদন হ্রাস পাচ্ছে।
ভাটার চাহিদা মেটাতে কৃষিজমির গুরুত্বপূর্ণ অংশের এমন ক্ষতি করা হলেও এটি বন্ধে প্রশাসনের তেমন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অথচ ভাটার সর্বশেষ আইন অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি ভাটায় ব্যবহার নিষিদ্ধ। সরেজমিনে জেলার পৌর এলাকার দাশড়া, সদর উপজেলার তেরদোনা, বাঘিয়া, নবগ্রাম, ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের কলাসি গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, তিন ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। মূলত কৃষকদের ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে জমির মাটি কেটে নিচ্ছে ভাটা মালিকরা। কৃষকদের বোঝানো হয় উঁচু জমিতে ধান আবাদ হবে না, জমি থেকে সেচের পানি নেমে যাবে, ওপর থেকে মাটি বিক্রি করে দেওয়া ভালো, ওপরের মাটিতে ভাইরাস-ময়লা আছে, ওপরের মাটি বিক্রি করে নিচের ভালো মাটিতে চাষ করলে বেশি ফসল হবে- ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এ বিভ্রান্তি ছড়াতে ও কৃষককে প্ররোচিত করার কাজে সক্রিয় রয়েছে ভাটা মালিক ছাড়াও মাটি সরবরাহকারী এক শ্রেণির দালালচক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, একটি ফসলি জমির পাশ থেকে মাটি কেটে আনলে অন্য কৃষক জমি ভাঙনের ভয়ে বাধ্য হয়ে ভাটা মালিকদের কাছে মাটি বিক্রি করে থাকে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে নেজারত ডেপুটি কালেক্টর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট ১২৩টি ওয়ারি ইট ভাটা আছে যার মধ্যে ১৮ ভাটার কোনো লাইসেন্স নেই। ১২৩টি ইটভাটার মধ্যে সদর উপজেলায় ভাটা রয়েছে ৩৫টি, সিংগাইর উপজেলায় রয়েছে ৬১টি, ঘিওর উপজেলায় রয়েছে ৬ টি, সাটুরিয়া উপজেলায় রয়েছে ১৪টি, শিবালয় উপজেলায় রয়েছে ৪টি, হরিরামপুর উপজেলায় ২ টি এবং দৌলতপুরে ১টি ইটভাটা রয়েছে। লাইসেন্স নেই সদর উপজেলার ৩টি ভাটার, সিংগাইর উপজেলায় ৯টি, সাটুরিয়া উপজেলার ১টি এবং হরিরামপুর উপজেলায় ২টি ভাটার। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০১৮ সালে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ২টি ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন করা নেই এবং হাইকোর্টে মামলা চলছে ৫টি ভাটার, সিংগাইর উপজেলায় ৯টি ভাটার নবায়ন করা নেই এবং হাইকোর্টে মামলা চলছে ১ টি ভাটার, ঘিওর উপজেলায় ১টি ভাটার লাইসেন্স নবায়ন করা নেই, সাটুরিয়া উপজেলায় ২টি ভাটার নবায়ন করা নেই এবং হাইকোর্টে মামলা চলছে ৪টি ভাটার এবং শিবালয় উপজেলায় ২ টি ভাটার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা চলছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে তেরদোনা চকের মাটি ব্যবসায়ী শান্তা জানায়, আমরা স্থানীয় হক ব্রিকস ইট ভাটায় মাটি বিক্রি করেছি। এখানে আমরা জসিম, ভেটু হায়াত যৌথভাবে মাটি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। এ বিষয়ে বাঘিয়ার চকের মাটি ব্যবসায়ী রাজ্জাক জানায়, আমার ৩২ শতাংশ জমির মাটি কেটে ইট ভাটায় বিক্রি করেছি। মাটি কেটে নেয়া জমিতে আমি মাছ চাষ করবো।
ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের কলাসি গ্রামের মাটি ব্যবসায়ী সেন্টু ও সালাম জানায়, আমরা ২৫ শতাংশ জমির মাটি কিনেছি। এজন্য এ স্থান থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছি। জমির মালিক বধূটি গ্রামের তোমেজ উদ্দিনের ছেলে আনিছ মোল্লা জানান, এই জমিটি আসলে দুই ফসলি। তাই মাটি বিক্রি করে দিয়েছি। মাছ চাষের জন্য একটি পুকুর করবো এখানে।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, জেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ রয়েছে ৯৮ হাজার ৫শ হেক্টর । কৃষি জমি থেকে টপ সয়েল কেটে নিলে আসলে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা যতটুকু সম্ভব কৃষকদের বোঝানোর চেষ্টা করি যাতে করে কৃষক ফসলি জমি থেকে মাটি বিক্রি না করে।
জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস জানান, আমি প্রত্যেক উপজেলার ইউএনওকে টপ সয়েল কেটে যারা কৃষি জমির ক্ষতি করছে তাদের উপর নজরদারি রাখার নির্দেশ দিয়েছি। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ভাটা মালিকদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবো।