একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ২৯৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৪৪ জন সংসদ সদস্যই কোটিপতি। গতকাল রবিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ীদের তথ্য উপস্থাপন শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। মোট ৮১ দশমিক ৮৭ শতাংশ সংসদ সদস্যের সম্পদ কোটি টাকার ওপরে।
লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার জানান, নির্বাচিতদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৮৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের প্রবেশ বাড়ছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্বাচিতদের ৬১ দশমিক ৭ (১৮২ জন) শতাংশের পেশা ব্যবসা। মহাজোট থেকে নির্বাচিতদের ৬০ দশমিক ৪১ এবং ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিতদের ৭১ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যবসা। আইন পেশায় রয়েছেন ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সংসদে ব্যবসায়ীদের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা বা ক্ষেত্রমতে থানা ও জেলা কমিটির দলীয় সদস্যগণ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীর প্যানেল তৈরি করবেন এবং কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বোর্ড উক্ত প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। কিন্তু এ বিধানটি কোনো দলকেই অনুসরণ করতে দেখা যায়নি।
প্রার্থীদের মামলার চিত্র তুলে ধরে সুজন জানিয়েছে, নির্বাচিত ২৯৮ জনের মধ্যে ২১ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে। অতীতে ছিল ১২২ জনের বিরুদ্ধে। বর্তমানে আছে এবং আগেও মামলা ছিল এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১৬। ৩০২ ধারায় মামলা রয়েছে এমন প্রার্থী ৪ জন। অতীতে ছিল ৩৩ জনের বিরুদ্ধে। নির্বাচিতদের মধ্যে ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ৪০ জন।
নির্বাচনে অনিয়মেরও অনেক অভিযোগ সুজনের চোখে পড়েছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘কোনো কোনো কেন্দ্রে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া, ভোটারদের প্রকাশ্যে সিল মারতে বাধ্য করা, দীর্ঘ সময় লম্বা লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ না করা, কোনো কোনো কেন্দ্রে অস্বাভাবিক বেশি বা কম ভোট পড়া, ইভিএম ও অন্য আসনগুলোর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা লক্ষণীয় ছিল।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘প্রচার প্রচারণার পুরো সময় জুড়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, নির্বাচনী প্রচারণায় বাধাদান, হামলা, গ্রেফতারি-হয়রানি ইত্যাদি কারণে অনেক প্রার্থীর নির্বিঘ্নে প্রচার কাজ চালাতে না পারার অভিযোগ উঠেছে। বাধার কারণে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও সমর্থকরা প্রচারণা চালাতে না পারা, বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকাসহ অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনে ১৭ জন নিহত, বেশিরভাগ কেন্দ্রে ঐক্যফ্রন্ট ও তার নেতাকর্মী এবং পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিত দেখা গেছে। আবার বাধা না থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রার্থীকে প্রচারণায় নামতে দেখা না যাওয়ার অভিযোগ আছে। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকের বিরুদ্ধে অনিয়মের সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণা চিত্র দেখে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কতটা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে।’
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয় হয়েছে এবং মহাবিপর্যয় হয়েছে ঐক্যফ্রন্টের। এর কারণ অনুসন্ধান করলে দুটি বিষয় বেরিয়ে আসবে। এগুলো হচ্ছে— জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নির্বাচনী অনিয়ম। অনিয়মের অভিযোগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা কোনো নিবাচন পর্যবেক্ষণ করি না। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর কাজ করি। নির্বাচন নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনে যে সব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে— কমিশনের দায়িত্ব হবে সেগুলো তদন্ত করা। অনিয়ম প্রমাণিত হলে নির্বাচন বাতিল করারও ক্ষমতা আছে কমিশনের। সুজন সম্পাদক বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না পারা বিএনপির পক্ষ থেকে যেমন অভিযোগ করা হয়েছে। তেমনি প্রচারণার সময় সহিংসতার কারণে আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রাণ গেছে সবচেয়ে বেশি।’ সম্মেলনে নিজের ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘একজন ভোটার হিসেবে আমি আসলে অনেক বিকল্প পাইনি। আমি নিজে ভোট দিয়েছি, ভোট দিতে পেরেছি, ২০০৮ এর পরে এইবারই প্রথম। হ্যাঁ, সবাই পার্টিসিপেট করেছে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততার যে বিষয়টা থাকে, ভোটার হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি সেটা মিস করেছি। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান প্রমুখ।