ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা-বাবা

পৃথিবীতে মহান সৃষ্টিকর্তার পরেই হচ্ছে মা-বাবার স্থান। ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বাণী দিয়েছেন। তেমন প্রত্যেক ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার পরেই মা-বাবাকে সম্মান দেওয়া হয়েছে। আমরা এই পৃথিবীতে মহান সৃষ্টিকর্তার রহমতে মা-বাবার মাধ্যমে এসেছি। একজন মা তার সন্তানকে দীর্ঘ ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে রেখে পৃথিবীর আলো দেখায়। শুধুমাত্র একজন মা বোঝে এই প্রসব যন্ত্রণা। আজকে তারা সারাজীবন কষ্ট করে নিজে খেয়ে না খেয়ে তার সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলে। সামনে যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেনো তাদের চিন্তা থাকে আমাদের সন্তানকে কিভাবে সমাজের একজন উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো। সেই আমরা যখন বড় হয়ে যাই, যখন তথাকথিত মানুষ হয়ে যাই তখন জন্মদানকারী মা-বাবাকে ভুলে যাই। তথাকথিত আধুনিক সভ্য সমাজ থেকে মা-বাবাকে দূরে ঠেলে দিই। যে সময়টাতে একজন মা-বাবার সব থেকে বেশি প্রয়োজন তার সন্তানকে, ঠিক সে সময়ে আমরা তাদেরকে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেই। যেখানে আছে শুধু হতাশা, কষ্ট আর একাকিত্ব। অথচ একজন সন্তানের হতাশা, কষ্ট, একাকিত্বের সময় তার মা-বাবাই হয় তার সর্বক্ষণের সারথি। সেই মা-বাবাকে আমরা আজকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছি। আমরা বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আনন্দ করছি। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকে যারা সন্তান তারাও আগামীতে বৃদ্ধ মা-বাবা হবে। আজকে আমরা আমাদের মা-বাবার সঙ্গে যে ব্যবহার করছি ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের কাছ থেকেও আমরা সেই একই ব্যবহার পাবো। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি এমন একটি সংস্কৃতি যা অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং একটি সমাজ ব্যবস্থার জন্য পরিপূর্ণ।  একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি আমাদের এই বাঙালি জাতি থেকেই উদ্ভব। অতীতে আমরা সকলে মিলে একটা একান্নবর্তী পরিবারের সঙ্গে সুখে শান্তিতে বাস করতাম। কিন্তু এখন সেই একান্নবর্তী পরিবারের কথা ওই রূপকথার কল্পকাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  আজকে আমরা অন্য সংস্কৃতির ধারা প্রভাবিত হয়ে একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা থেকে বের হয়ে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছি। আজকে বাংলাদেশে বেশিরভাগ জায়গায় ওই একক পরিবার। যেখানে থাকে শুধু স্বামী-স্ত্রী, সন্তান। আর মা-বাবাকে তারা বোঝা মনে করে রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। এরপর আর কখনও ফিরেও তাকায় না। আজকাল পত্রিকা বা টেলিভিশন খুললেই দেখা যায় সন্তান তার মা-বাবার উপর অত্যাচার করে ঘর থেকে রাস্তায় বের করে দেয় বা তাদের ঠাঁই হয় গোয়ালঘরে। এগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-এর বদৌলতে আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি।  বিবেক বোধ বিসর্জন দিয়ে আমরা এগুলো করছি, আবার অন্য কেউ ভুল ধরিয়ে দিলেও আমরা অনুতপ্ত হই না। যে মা-বাবা তার সন্তান অসুস্থ হলে রাতের পর রাত জেগে তার সন্তানের সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলে, সেই সন্তান হয়ে আমরা আমাদের অসুস্থ মা-বাবাকে বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এগুলো বর্তমানে আমাদের দেশে হচ্ছে, আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে হচ্ছে। ইদানীং বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম এর সংখ্যা বেড়ে গেছে। যা আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়কেই ইঙ্গিত করে। অথচ আমরা যারা নিজেদের মা-বাবাকে ওই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি তাদের কাছে বলবো তারা যাতে নিজেরা প্রথমে গিয়ে ওখানে দেখে আসে। কি নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করে ওখানকার হতভাগ্য মানুষগুলো! তাদের সন্তানদের কাছে পাওয়ার আকুতি ওখানকার পরিবেশকেও ভারী করে তোলে। আমরা সবসময় মনে রাখবো যে মা-বাবার দ্বারা আমরা পৃথিবীতে এলাম, যাদের জন্য আজকে আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাদের প্রতি আছে আমাদের অনেক দায়িত্ববোধ। আর যে সব স্ত্রীরা স্বামীদের থেকে তাদের মা-বাবাকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন তারাও মনে রাখবেন আপনারাও কোনো মায়ের  সন্তান, কোনো বাবার আদরের কন্যা। তাই আপনারা আপনাদের স্বামীকে বিপথে নেওয়ার বদলে তাদেরকে এসব ঘৃণ্য কাজ করা থেকে বিরত রাখবেন। কারণ আমাদের এই রক্তে অর্জিত মহান বাঙালি সংস্কৃতিতে বৃদ্ধাশ্রম খুবই বেমানান। আমাদের সংস্কৃতি বলে মা-বাবাসহ পরিবারের সকলকে নিয়ে একান্নবর্তী পরিবারের মাঝে বাস করতে। তাই আমরা নিজেরা নিজেদেরকে ভালোবাসবো, মা-বাবাকে তাদের উপযুক্ত সম্মান দিবো এবং সবসময় তাদের প্রয়োজন বলার আগেই পূরণ করবো আর অসুবিধা দূর করবো। কারণ আমাদের দ্বারা যদি তারা কষ্ট পান তাহলে ইহজগতেও আমরা সুখী হবো না, আর পরকালেও সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হবো। তাই বাঙালি সংস্কৃতির প্রত্যেকটি বাঙালির চিন্তাভাবনা হওয়া উচিত কিভাবে দেশ থেকে এই বৃদ্ধাশ্রম প্রথা উঠানো যায়। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা-বাবা, ভালো থাকুক সকল সন্তানেরা আর অটুট থাকুক এই বাঙালি সংস্কৃতি।

n লেখক :ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়