বিশ্বজুড়ে ফেসবুকের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্রান্সের গণমাধ্যম এএফফির তথ্যমতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দুশ’ কোটি ছাড়িয়েছে (অক্টোবর, ২০১৮ পর্যন্ত)। তার মধ্যে আড়াই কোটি বাংলাদেশি রয়েছে। আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হচ্ছে, মোট ব্যবহারকারীর প্রায় অর্ধেক হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক! অর্থাত্ তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ২০১৬ সালের ইউনিসেফ রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু। প্রথিতযশা মনোচিকিত্সক অধ্যাপক ড. আনোয়ারা সৈয়দ হক মনে করেন, মনোদৈহিক সমস্যা ও সামাজিক অস্থিরতার বড় কারণ এখন ফেসবুক। তিনি আরো মনে করেন, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা মনোদৈহিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক অর্থাত্ শিশু-কিশোরেরা সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে না। এর ফলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
ফেসবুকের প্রতি শিশুদের অতিমাত্রায় আসক্তি দেখে মনোবিজ্ঞানীরা ফেসবুককে ‘ডিজিটাল কোকেন’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। কোকেন যেমন মানুষের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয়, ফেসবুকও তেমনি শিশু-কিশোরদের স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে। কোকেনের মতো ফেসবুকও শিশু-কিশোরদের সাময়িক আনন্দ দিলেও বিরাট ক্ষতি ডেকে আনে। কথাগুলো শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও প্রযোজ্য। শুধু ফেসবুক নয়; টিভি, স্মার্টফোন, ট্যাব, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভার্চুয়াল গেমে আসক্তি শিশু-কিশোরদের বিরাট ক্ষতিসাধন করে। এই বিরাট ক্ষতি থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষার জন্য অভিভাবকদের যা করণীয় তা হলো :
১. সন্তানকে বকাঝকা নয়, উদ্বুদ্ধ করুন। তাকে ঘরের কাজে ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করুন। আপনি সন্তানের ভালো বন্ধু হোন, যাতে সে সবকথা আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে পারে।
২. সন্তানকে উপদেশ দেবেন না, তারা চায় দৃষ্টান্ত। আপনি যা করবেন, তারা তাই করবে। কারণ শিশু-কিশোরেরা অনুকরণপ্রিয়। আপনি ভার্চুয়াল লাইফে আসক্ত হলে আপনার সন্তানও কিন্তু তাতে আসক্ত হয়ে পড়বে।
৩. সন্তানদের আবদার মেটাতে বা কান্নাকাটি থামাতে গিয়ে কোনোক্রমেই ১৮ বছর না হওয়ার আগে তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেবেন না।
৪. প্রয়োজন ছাড়া রাত জাগার অভ্যাস আপনার সন্তানদের ভার্চুয়াল লাইফে আসক্ত করে তুলতে পারে। তাই ১০টার মধ্যেই আপনার সন্তানদের ঘুমোতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে উত্সাহিত করুন।
৫. আপনার সন্তানদের ধর্মীয় বিষয় ও নৈতিকতার শিক্ষা দিন। নিজে ধর্ম পালন করুন, তাকে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করুন।
৬. নিজে মানুষের সেবা ও কল্যাণে এগিয়ে আসুন এবং আপনার সন্তানকেও এগিয়ে আসতে উত্সাহিত করুন। মনে রাখবেন, মানুষ ও সমাজের কল্যাণে কাজ হতাশা-বিষণ্নতা-একাকিত্বের অনুভূতি হ্রাস করে। যা ভারচুয়াল লাইফ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
আজকের শিশু-কিশোরেরাই আগামী দিনের সম্পদ। ডিজিটাল কোকেন থেকে এদের বাঁচাতে হবে। অভিভাবকদের কিছু পদক্ষেপই পারবে ফেসবুক-স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে তাদের সন্তানদের রক্ষা করতে। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, সচেতনতা আর সচেতনতা।
n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়