গণিত তথা অঙ্ক শাস্ত্রের ইতিকথা

মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

B) বর্তমানে গণিত বহুবিধ শাখা প্রশাখা বিস্তার করে থাকলেও এর প্রথম দিকে মোটামুটি পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি এই তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং এরপর যোগ হয়েছে ত্রিকোণমিতি। প্রথমে পাটিগণিতের কথা ধরা যাক। অবশ্য সবক্ষেত্রেই মনের ধারণার আবর্তে মুদ্রা তথা আঙ্গুলের মাধ্যমে গুণে সমাধান করা গেলেও জটিল ক্ষেত্রে না লিখে আর পারা যায় না? তখন তো লিখার দ্রব্যাদি দরকার। এক্ষেত্রে পাটিগণিত নামকরণের পেছনে দু’ধরনের অভিমত পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। একটি হলো কি দিয়ে লিখা হবে? এবং কার উপর লিখা হবে? আর যার উপর লিখা হবে, সে ক্ষেত্রটি কি? তখন কাগজ ছিল না বিধায় সেক্ষেত্রে মাটি বা বোর্ড বা পাটির কথা স্বভাবতই উঠে আসে। সে সময়ে মূলত খরিমাটি দিয়ে লিখা বা অঙ্ক কষা হতো। তখন শিক্ষা ব্যবস্থা উপসনালয় ভিত্তিক ছিল বিধায় উপসনালয়ের পাশে বা গুরুগৃহের আঙ্গিনায় মাটি বা পাটির উপর বালি ছড়িয়ে এই কার্যক্রমটি

সমাধান করা হতো। তখনই সম্ভবত পাটির সূত্র ধরে পাটিগণিত কথাটি এসেছে বলে মনে করা হয়। আবার যেহেতু বালি বা ধূলি মাটির উপর লিখা হতো। তাই অনেকে পাটিগণিতকে ধূলিকর্ম বলে অভিহিত করে থাকেন। এদিকে পাটিগণিতের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো অ্যারিথম্যাটিক (Arithmetic), এটি এসছে গ্রীক শব্দ  অ্যারিথমোস হতে, যার মানে হলো সংখ্যা। দ্বিতীয় অভিমতটি হলো অংক করার সময় পাটে পাটে সাজিয়ে করা হতো। এক্ষেত্রে এখানকার সময় সেই সেটের (Set) কথা এসে যায়। যাহোক, পাটে পাটে অঙ্ক করায় সূত্র ধরে অনেকে মনে করেন পাটিগণিত শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে সমগ্র বাংলাদেশে মানুষের জীবন ধারা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের আদলে কয়েক যুগ আগে একটি পাটিগণিত প্রণীত হয়েছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে সেই যাদবের পাটিগনিতের বৈচিত্র্যের কথা। তাছাড়া তত্কালীন সময়ে ধারাপাতও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না? এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, প্রাচীনকালে আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, দ্বিতীয় ভাস্কর থেকে মাধব, নীলকান্ত ও পুতুমান পর্যন্ত সবাই ভারতে ধ্রুপদী অঙ্কশাস্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বাংলার অবদান তেমন না থাকলেও ইতিহাস থেকে এ কথা সূক্ষ্মভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রিষ্টপূর্বের সময়কালে কয়েক ধরনের গণিত চলমান ছিল। তখন আধাকা, দ্রোণ, কাকা, কড়া, গন্ডা ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। কালের পরিক্রমায় গণিত এগিয়ে যেতে থাকে। পঞ্চানন ঘোষ কর্তৃক প্রকাশিত ‘শুভঙ্করী’ শীর্ষক বই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাছাড়াও গণিতশাস্ত্রে গুরুদাস ব্যানার্জী ও স্যার আশুতোষ মুখার্জির অবদান কম ছিল না?

C) তত্পর যে গণিতাংশ আসে তা হলো বীজগনিত। বীজগণিতের ইংরেজী হলে Algebra, যা আরবি Al-jebr শব্দের অপভ্রংশ হয়ে উত্থিত এবং এখনও চলমান। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে বীজগণিত নামে কেন নামকরণ করা হলো? সে প্রেক্ষিতে উল্লেখ্য যে, প্রকৃতির চলমান ও শাশ্বত ধারায় একই বীজ দিয়ে একের পর এক গাছ হয় থাকে। আর এই প্রক্রিয়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতেই থাকবে। ঠিক এই গনিতে সিম্বল (Symbol) তথা বীজ ব্যবহার করে নানা রকম গানিতিক সমস্যা সমাধানপূর্বক ফলাফল লাভ সম্ভব। এই সূত্র ধরে বাংলায় এই গণিতকে বীজগণিত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। এখানে মজার ব্যাপার হলো পাটিগণিতে জানা সংখ্যা ব্যবহার করা হয়ে থাকে; পক্ষান্তরে বীজগনিতে সংখ্যার বদলে অজানা সংখ্যা বা বর্ণ তথা বীজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বীজ বলতে প্রতীক (Symbol) হিসেবে অক্ষর বা অন্য কিছু বুঝানো হয়েছে। মূলত বড় বড় সমস্যা বা বৈজ্ঞানিক ফলাফল পেতে বিশ্লেষণ গনিতের (Analytical Mathematics) আওতায় এই বীজগণিতই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে প্রাচীন ভারতে ব্রহ্মগুপ্ত নামে একজন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ছিলেন। তিনিই সর্ব প্রথম পাটিগণিত ও বীজগণিতের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি এই বিষয়টি তাঁর লিখিত ‘ব্রক্ষফুট সিদ্ধান্ত’ বইয়ে ‘কুট্টক’ অধ্যায়ে উল্লেখ করেন। যাহোক, এরপর যে বিষয়টি আসে তা হলো জ্যামিতি বা ক্ষেত্রগণিত। ইংরেজীতে একে বলে Geometry (জিওমেট্রি); যা গ্রীক Geometria শব্দ থেকে এসেছে। এখানে Geo মানে পৃথিবী, আর Metron হচ্ছে পরিমাপ। আর বাংলায় জ্যামিতি শব্দটি হলো একই ভাবে জ্যা অর্থ ভূমি বা পৃথিবী এবং মিতি (যার অর্থ পরিমাপ করা) থেকে। এ কথা সত্য যে, আধুনিক জ্যামিতির জনক মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রীক পণ্ডিত ইউক্লিড, তাঁর ‘Elements’ নামক তের খন্ডের বিখ্যাত বইতে এখনও জ্যামিতির সঠিক দিক-নির্দেশনা মেলে। আবার এরই সাথে যোগ হয়েছে ত্রিকোণমিতি তথা Trigometry, যা ত্রিভুজের তিনটি কোন সহ এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য অন্যান্যদের মধ্যে মিসরীয়দের অবদান প্রণিধানযোগ্য।

D) পূর্বেই বলেছি গনিতের আদি ভিত্তি হলো সংখ্যা বা Digit। এক্ষেত্রে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁরা হলেন, গ্রীসের পিথাগোরাস ও ভারতে আর্যভট্ট। তত্পর যার কথা আসে, তিনি হলেন প্রাচীন ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ ‘ভাস্করাচার্য’। আর গণিত এককভাবে হয়নি, এটি ক্রমবিকাশের মাধ্যমে কাল থেকে কালান্তরে একজনের পর একজন অবদান রেখে চলেছেন এবং তা এখনও অব্যাহূত আছে। এঁদের অন্যতম প্রধান হলেন, আর্কিমিডিস, নিউটন, লিবনিত্স, ফ্রেডরিচ গাউস, নিওনার্দো অয়লার, আলবার্ট আইনস্টাইন, ইউক্লিড, কার্ল পিয়ারসন; রেনে দেকার্তে; জর্জ ক্যান্টর; প্রমুখ। পরিশেষে যাঁর কথা বলে শেষ করছি। তিনি হলেন মহীয়ষী নারী গণিতজ্ঞ ফিবোনাসি্স। তিনি গনিতের রাশিমালা সাজিয়ে কিছু অজানা বিষয় উদ্্ঘাটনের জন্যে ব্রতী হয়েছিলেন, যেমন- গাছ-পালা কিভাবে বাড়ে, মানুষ কেমন করে বড় হয়, পাখীরা কি ভাবে উঁড়ে, ইত্যাদি? কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে এই রহস্যপূর্ণ জটিল বিষয়টি থেমে যায়। যদি ভবিষ্যতে এমন কেউ তাঁর বিষয়টির সূত্র ধরে এই নিগুঢ় রহস্য উদ্্ঘাটন করতে পারেন; তাহলে সৃষ্টি জগতে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে প্রতীয়মান হয়। আর একটি কথা, গনিতের কার্যক্রম যদি না থাকতো, তাহলে এই বিশ্ব পাথর যুগের মধ্যেই কেবল ঘুরপাক খেতো। এবার ভেবে দেখুন, গণিতের অবদান কত বড় অপরিসীম?