ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ :মানবিক বিপর্যয়ের ইতিকথা

গৃহযুদ্ধ, গোত্রদ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক সংকটে ক্ষত-বিক্ষত মধ্যপ্রাচ্য। অধিকাংশ রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে কালাতিপাত করছিল গরিষ্ঠ জনগণ। আরব বসন্ত বা গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে জাজিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের ইয়েমেনেও গণঅভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে। আর সব স্বৈরাচারী শাসকদের মতো সেখানেও জেঁকে বসেছিলেন আলী আব্দুল্লাহ সালেহ। তখন তার শাসনের তিন দশক অতিক্রান্ত হচ্ছিল।  গণআন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০১১ সালে সালেহ সরকারের মধ্যেই বিভেদ দেখা দেয়। ক্ষমতাসীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ মনসুর হাদী জনগণের পক্ষ অবলম্বন করেন। দীর্ঘ কালক্ষেপণ এবং নানা ধরনের ছলচাতুরির পর সালেহ ক্ষমতা ত্যাগ করেন। ভাইস-প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা পরিত্যাগ করলেও রেখে যান তার অনুগত সেনাবাহিনী। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়ায় ইয়েমেনে বিরোধ সংঘাত এবং পারস্পরিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকেই যায়।

নতুন প্রেসিডেন্ট হাদী ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই ঐ সব সমস্যায় আকীর্ণ হয়ে পড়েন। ইয়েমেনে দুর্বল সরকারের অবস্থানে ৪টি প্রধান সমস্যা দেখা দেয়। ১. দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আবার শুরু হয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে, দক্ষিণ ইয়েমেন সম্পূর্ণ স্বাধীন পৃথক রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন একত্রিত হলেও বিরোধের জের বজায় থাকে। ২. আল-কায়েদা এবং আইএস ইসলামি জঙ্গিদের তত্পরতা বৃদ্ধি পায়। ৩. সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ’র অনুগত বাহিনীর সরকারের প্রতি ্পূর্ণ সহযোগিতা দান না করা। ৪. দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য এবং বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়া। এসবের ফলে খাদ্য সংকট প্রবল হয়ে পড়ে। গোত্রদ্বন্দ্ব প্রভাবিত ইয়েমেনে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতায় উত্তরাংশের সাদা প্রদেশ এবং তদসংলগ্ন এলাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হুদি গোত্র ঐ এলাকার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, এরা বিগত এক দশক ধরে সালেহ তথা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিল। রাজধানী সানা অভিমুখে তাদের অগ্রাভিযান চলছিল। কেন্দ্রীয় অরাজক অবস্থা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে সাধারণ মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে শক্তিশালী হুদি গোত্রকে সমর্থন দেয়। সাধারণ সুন্নি মুসলমানরাও তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। এর ফলে ২০১৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০১৫ সালের প্রথম দিকে হুদিরা রাজধানী সানা দখল করতে সক্ষম হয়। এই অবস্থায় সৌদি আরবে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ রাজধানী সানা পুনর্দখলে সৌদি আরব এবং তার মিত্রদের সহায়তায় একটি বহুজাতিক মিত্রশক্তি গঠনে সক্ষম হন। এই মিত্রশক্তি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সানায় তাদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। এর পর এই বাহিনী সমগ্র ইয়েমেনের উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হয়। এ সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করে। ইতোমধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হাদীর মধ্যে কৌশলগত ঐক্য অর্জিত হয়। রাজধানী সানার পতনের পর তিনিও সৌদি আরবে পলায়ন করেন। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ক্রমশ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করে। হুদি সম্প্রদায়ের লোকেরা শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে প্রধান শিয়া রাষ্ট্র ইরান তাদের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে। যদিও প্রকাশ্যে তারা বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

পাশ্চাত্যের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ২০১৫ সালের আগষ্ট মাসে ইয়েমেনে প্রধান সমুদ্রবন্দর এডেনে অবতরণে সক্ষম হয়। পরবর্তী মাসগুলোতে তারা দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা থেকে হুদিদের বিতাড়ন করে। কিন্তু রাজধানী সানা তখনো এবং এখনো হুদিদের দখলে থেকে যায়। প্রেসিডেন্ট হাদীর নেতৃত্বে সরকারি দল সমুদ্রবন্দর এডেনে তাদের সাময়িক রাজধানী স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা জনসাধারণকে সেবা ও নিরাপত্তা প্রদানের চেষ্টা করে। তবে প্রেসিডেন্ট নিজে সৌদি আরবেই অবস্থান করেন। এদিকে হুদিরা রাজধানী সানায় তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি তৃতীয় সমুদ্রবন্দর তাইজ দখল করে নেয়। তারা সৌদি আরবকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বেশ কয়েক বার হুদিরা সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে তারা এর দ্বারা তেমন কোনো ক্ষয়-ক্ষতি করতে পারেনি। সৌদি আরবের সতর্কতার কারণে ঐসব মিসাইল আঘাত হানার আগেই অকার্যকর করে দেওয়া হয়। এ সময়ে সৌদি আরব এবং পাশ্চাত্যের স্বাভাবিক শত্রু আল-কায়েদার ‘জাজিরাতুল আরব ব্রাঞ্চ’ এবং কথিত ইসলামিক ষ্টেট-এর যোদ্ধারা দখলকৃত এডেনে বেশ কয়েকবার মারাত্মক হামলা করে। ২০১৭ সালে নভেম্বর মাসে সৌদি আরবের রিয়াদে মিসাইল হামলার পর বহুজাতিক বাহিনী তাদের হামলা জোরদার করে। তারা রাজধানী সানা অভিমুখে তাদের যুদ্ধ ও বিমান হামলা সম্প্রসারণ করে।

যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ যেকোনো দেশ বা জাতি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনে। ইয়েমেনের বিগত কয়েক বছরের আত্মঘাতী যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব মোতাবেক ৬ হাজার ৮ শ বেসামরিক লোক নিহত এবং ১০ হাজার ৭ শ লোক আহত হয়েছে। এ হিসাব ২০১৫ সালের মার্চ মাসের। এদের অর্ধেক নিহত হয় সৌদি বহুজাতিক বাহিনীর নির্বিচার বোমাবর্ষণে। অন্য আরেকটি দায়িত্বশীল সংস্থার পরিসংখ্যানে বলা হয়, এ পর্যন্ত (২০১৮) মৃতের সংখ্যা ৬ লক্ষ অতিক্রম করতে পারে। প্রাপ্ত হতাহতের তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান প্রদান করা হয়। এছাড়া কলেরা, অপুষ্টি এবং অনাহারে আরো হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রধান মার্ক লোকক গত সপ্তাহে বলেছেন যে, ইয়েমেন মারাত্মক দুর্ভিক্ষে পতিত হয়েছে। সমুদ্রবন্দর দুটি বিপরীত শক্তির দখলে থাকায় সেখানে খাদ্যশস্যসহ জরুরি মানবিক সাহায্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হুদি বাহিনী নমনীয় হলেও সৌদি বাহিনী কঠিন ও কঠোর মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছে। তারা হুদি দখলকৃত অঞ্চলে কোনোরকম খাদ্য ও মানবিক সাহায্য পৌঁছতে দিচ্ছে না। জাতিসংঘ বলছে, ১০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে নিপতিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী এবং শিশুরা। দুই মিলিয়ন শিশু বর্তমানে মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। তারা নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক শিশু সংস্থা সেভ-দ্যা সিলড্রেন বলছে, এবছরের শেষের দিকে ৮৫ হাজার শিশু মৃত্যুবরণ করতে পারে। উল্লেখ্য যে, এ গৃহযুদ্ধের ফলে ২০১৭ সালের প্রথম দিকে ইয়েমেনে মহামারি আকারে কলেরার প্রকোপ দেখা দেয়। সেখানে আড়াই হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে।

এসব হাজারো মৃত্যু এবং ধ্বংসের মধ্যেও ক্ষমতার লড়াইয়ের নির্মমতা থেমে নেই। থেমে নেই ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার সমীকরণ এবং বিপরীত সমীকরণ। ২০১৭ সালের নভেম্বরের দিকে প্রেসিডেন্ট সালেহ এবং হুদি বিদ্রোহীদের মধ্যে নিপাতনে সিদ্ধ ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। রাজধানী সানার সবচেয়ে বড় মসজিদের কর্তৃত্ব নিয়ে সাময়িক সম্পর্ক ভেঙে যায়। দু’পক্ষের সংঘর্ষে প্রেসিডেন্ট সালেহ ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রাণ হারান। সালেহ’র মৃত্যু তার নিজ পক্ষেও বিরোধ ডেকে আনে। এভাবে ইয়েমেনের রাজনৈতিক, আর্থিক এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা অকল্পনীয় অরাজকতায় পরিণত হয়। তবে এর মাঝেও শান্তির প্রয়াস আছে।

জাতিসংঘের তরফে যুদ্ধ বিরতির অব্যাহত চেষ্টা আছে। বিগত ১৯ ডিসেম্বর সুইডেনে যুদ্ধমান দু’পক্ষের মধ্যে একটি খণ্ডিত সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী লোহিত সাগর তীরবর্তী তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হোদাইদাহ থেকে হুদিরা সেনা প্রত্যাহার করবে। সমঝোতা অনুযায়ী দু’পক্ষের ১৫ হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের কথা রয়েছে। মূলত খাদ্য সাহায্য আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সমঝোতা অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাজধানী সানার বিমান বন্দর— যা এখনো হুদিদের দখলে রয়েছে সে সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গত তিন বছর ধরে এই বিমান বন্দরের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারী মার্টিন গ্রিফিথ বলেছেন, তারা একটি সামগ্রিক শান্তি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করছেন। উভয়পক্ষ এই জানুয়ারিতে আবার বৈঠকে মিলিত হতে রাজি হয়েছেন। এ সময়ে তারা শান্তিপূর্ণ মীমাংসার লক্ষ্যে একটি ‘রোড ম্যাপ’ প্রণয়নের চেষ্টা করবেন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে যে, সৌদি নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনী রাজধানী সানার বিমান বন্দরে বোমাবর্ষণ করেছে। এতে শান্তি প্রয়াস বিঘ্নিত হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। সৌদিরা অবশ্য অভিযোগ করেছে যে, বিমান বন্দর থেকে উত্থিত একটি ড্রোন হামলাকে প্রতিহত করবার জন্যই এই হামলা চালানো হয়। তারা আরো অভিযোগ করে যে, হুদিরা বিমানবন্দরকে সামরিক কাজে ব্যবহার করছে। এটা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লংঘন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা করছেন, উভয় পক্ষ যদি সংযত না হয় তাহলে কষ্টার্জিত খণ্ড সমঝোতাও ব্যর্থ হতে পারে। তারা আরো মনে করেন যে, যেহেতু জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা বিশ্ব অর্জিত সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেছে, সেহেতু তাদের চূড়ান্ত শান্তি অর্জনে অধিকতর সতর্ক হতে হবে। বিশ্ব জনমত আশা করে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন,  তেমন করে ইয়েমেন থেকে মার্কিন সহায়তা প্রত্যাহার করবেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক রাষ্ট্র ও শক্তিসমূহের সংযম ও সমঝোতা। তাহলেই এই অন্যায়, অমানবিক ও নির্মম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটবে।

n লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়