গার্মেন্টস শ্রমিকদের ফের অবরোধ, অগ্নিসংযোগ

ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাড়ানো ও বাস্তবায়নের দাবিতে সোমবার রাজধানীসহ গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও সাভারে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু করে বেলা ৩টা পর্যন্ত আবদুল্লাহপুর, উত্তরা ও বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে পোশাক শ্রমিকরা। এ সময় এনা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গাজীপুরে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কালিয়াকৈরে পুলিশ ফাঁকা গুলি করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ৯টা থেকে উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরের বিভিন্ন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা সড়কে জড়ো হতে থাকে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে তারা অবরোধ করে ওই রুটে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে রাস্তার উভয় দিকে  শতশত যানবাহন আটকে পড়ে। কর্তব্যরত পুলিশ শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় তারা এনা পরিবহনের একটি যাত্রবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ পিছু হটে।

দক্ষিণখান থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা জানান, বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকরা দক্ষিণখানের চালাবন ও উত্তরা এলাকার সড়ক অবরোধ করে অবস্থান  নেয়। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে থাকেন। যদি জ্বালাও-পোড়াও করেন তাহলে আমরা কোনো সহযোগিতা করব না। আমরা চাই আপনারা সরকারি কাঠামো অনুযায়ী  বেতন পান। গতকাল আমরা সহ্য করেছি, আজ করছি। আর করব না। তিনি আরো বলেন, আপনারা যদি অশান্ত হন, ভাঙ্চুর করেন-তাহলে আমরাও এ্যাকশনে যেতে বাধ্য হব। এটা প্রত্যাশিত নয়। কারণ পুলিশ আপনাদের প্রতিপক্ষ নয়। আপনাদের দাবি নিয়ে প্রয়োজনে আমরাও মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলব।

এরপর দুপুর ২টার দিকে নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান খশরুজ্জামান চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, আমি সরকারি কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেব। আপনারা ফিরে যান। যদি সরকারি কাঠামো অনুযায়ী বেতন দিয়ে গার্মেন্টস নাও চালাতে পারি, যদি গার্মেন্টস বন্ধ করে দিতে হয়, এরপরও আমি ১ মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে যাব। আশ্বাসের পর শ্রমিকরা সড়কের অবস্থান ছেড়ে দিলে দুপুর ৩টার দিকে যান চলাচল শুরু হয়।

সাভারে সড়ক অবরোধ

সকালে সাভারের হেমায়েতপুর বাগবাড়ি এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামস স্টাইলিং ওয়্যারস লিমিটেড ও টিসিএল-২ কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হলে শ্রমিকরা বাড়ি চলে যায়।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, সোমবার গাজীপুরে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সোমবার সকালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ছয়দানা মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, সাইনবোর্ড ও কুনিয়া তারগাছ এলাকার বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিভিন্ন পরিত্যক্ত বস্তু ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে ওই মহাসড়কে সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের কারণে কয়েকটি কারখানার কমপক্ষে ১৫ শ্রমিক আহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন পোশাক শ্রমিক নেতা মো: রুহুল আমীন। আহতদের বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গাছা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ ইসমাইল হোসেন জানান, সকাল ৯টার দিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাইনবোর্ড এলাকায় প্রথমে ইস্ট-ওয়েস্ট গ্রুপের কয়েকটি পোশাক কারখানার অপারেটররা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে। পরে সকাল ১০টার দিকে তারা কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। একই দাবিতে শ্রমিকরা কুনিয়া এলাকার লিজ ফ্যাশন ও রূপা গার্মেন্টসের শ্রমিকদের তাদের সঙ্গে আন্দোলনে নামার আহ্বান জানায় এবং বহিরাগত শ্রমিকরা রাস্তা থেকে কারখানার অভ্যন্তরে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় ওইসব কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে তারাও কর্মবিরতি শুরু করে এবং কারখানা থেকে বের হয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। তবে সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরে যেতে বললে তারা না মেনে মহাসড়কে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা  ধাওয়া ও সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। প্রায় দুইঘন্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এলে বেলা ১২টার দিকে যানচলাচল শুরু হয়।

ইস্ট ওয়েস্ট পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর মরিয়ম আক্তার জানান, সরকার ঘোষিত ন্যূনতম বেতন ৮ হাজার টাকা হেলপারদের দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে হারে অপারেটরদের বেতন বৃদ্ধি করেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন যাবত্ অপারেটররা তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মানছে না। তাই অপারেটররা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) থোয়াই অংপ্রু মারমা জানান, গাজীপুর ছাড়াও ঢাকার আব্দুল্লাহপুরে দুপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ চলার কারণে ঢাকাগামী যানবাহনকে টঙ্গীর কামারপাড়া রোড এবং ভোগড়া বাইপাস মোড় থেকে পূর্বাচলের তিনশ’ ফুট রোড দিয়ে চলাচলের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। মহাসড়ক সচল রাখতে পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কালিয়াকৈরে অবরোধ, ফাঁকা গুলি

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার নুর ওয়ার নামক একটি পোশাক কারখানায় সোমবার অপারেটররা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।