২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর

আজো নির্মাণ শেষ হয়নি উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মানবেতর জীবন

আজ ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, বরগুনা ও বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়। হাজার হাজার বাড়িঘর ও গাছপালা বিধ্বস্ত হয়। ধসে যায় মাইলের পর মাইল ওয়াপদা বেড়িবাঁধ। পরবর্তীতে উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে আধুনিক, টেকসই ও উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি ওঠে। পরবর্তীতে বাস্তবতা উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণখোলা মোড়েলগঞ্জবাসীকে দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে একটি উঁচু ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এখনো অনেক পরিবার ঘর বাড়ি না থাকায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

লণ্ডভণ্ড উপকূল

পিরোজপুর: আজ ১৫ নভেম্বর। ১১ বছর আগে ২০০৭ সালে এইদিন পিরোজপুরসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় সুপার সাইক্লোন সিডর আঘাত হানে। সিডরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় জনবসতি। সরকারি হিসেবে পিরোজপুর জেলায় সিডরে ৪০৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৮৫ জন নিখোঁজ হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি, ভেড়িবাঁধ। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বিদ্যুত্ ব্যবস্থা। গৃহহীন হয়ে পড়ে মানুষজন। সরকারি হিসেবে সিডরের আঘাতে জেলার সাতটি উপজেলার ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৭১ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫৪ হাজার ৪১৬টি ঘর-বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং আংশিক ক্ষতি হয় ১ লাখ ১৯ হাজার ৬০১টি ঘর। সিডরের আঘাতে ৭ হাজার ৯৭৬টি গরু-ছাগল, ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৩টি হাঁস-মুরগি মারা যায়। ১১ হাজার ৭৪৬.৪৩ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। জেলার ৭৩.৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ এবং ১৪৭.০৯ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কাঁচা-পাকা সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, অসংখ্য মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়।

সিডরে আক্রান্ত ও লণ্ডভণ্ড সুন্দরবন এবং বনের বিভিন্ন দ্বীপে শত শত জেলে মারা গেছে। তখন সুন্দরবনে কত মানুষ মারা গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যানও সরকারের কাছে নেই। শুধু বন বিভাগের একজন কর্মী নিহত হওয়ার কথা রেকর্ডে রয়েছে। অথচ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের নারিকেলবাড়িয়া, শ্যালারচর, কচিখালী ও দুবলারচরে প্রায় আড়াই হাজার জেলে সিডরে প্রাণ হারান। যাদের অনেকের লাশ যেমন বনের ভিতরে মাটি চাপা দেওয়া হয়, আবার সাগরে ভেসে যায় অনেক লাশ। কয়েকশ’ মত্স্য ব্যবসায়ী তাদের নৌকা-ট্রলার, অস্থায়ী ঘর, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

সিডরের ১১ বছরেও শরণখোলায়

বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি

শরণখোলা (বাগেরহাট): আজ ১৫ নভেম্বর সিডর দিবস। সুপার সাইক্লোন সিডরের ১১ বছরেও শরণখোলাবাসীর প্রাণের দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। তিন বছর মেয়াদের এ বেড়িবাঁধ প্রকল্প ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আরো দুই বছর কাজের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সিডর বিধ্বস্ত বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ পোল্ডারে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩’শ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু মেগা বাজেটের এ বেড়িবাঁধে নদী শাসনের ব্যবস্থা না থাকায় নির্মিত বাঁধ নদীতে বিলীনের আশঙ্কা এলাকার মানুষের। চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ করছে।

বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের স্থানীয় প্রকৌশলী শ্যামল কুমার দত্ত জানান, ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি শুরু হওয়া বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩’শ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫/১ পোল্ডারের ৬৩.২ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের কাজ সিএইচডব্লিউই নামে চাইনিজ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিন বছরে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও তারা এ পর্যন্ত ৫০ ভাগ কাজ শেষ করেছে। বেড়িবাঁধটি টপে চওড়ায় ৪.৫০ মিটার এবং বর্তমানের চেয়ে স্থান ভেদে দুই থেকে আড়াই মিটার উঁচু হবে। অত্র পোল্ডারে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮’শ ৯৯ জন। প্রকল্পের কাজের মধ্যে বলেশ্বর নদী তীর এলাকার ১১.৭৫০ কিঃমি সিসি ব্লকের কাজ, ১৫টি ড্রেনেজ স্লুইস গেট, ১৭টি ফ্লাসিং স্লুইস গেট ও পাঁচটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র দেড় কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ ধরা হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য মাত্র।

সাউথখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বাঁধ নির্মাণ কাজ খুবই মন্থরগতিতে চলছে। নদী শাসন ছাড়া বেড়িবাঁধ নির্মিত হলে তা পানিতে ভেসে যাবে। জনগণের কোনো কাজে আসবে না। ইতোমধ্যে সাউথখালীর গাবতলা ও বগী এলাকায় নতুন ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মাণের স্থানে আকস্মিকভাবে কয়েক দফা শত শত মিটার এলাকা জুড়ে সিসি ব্লকসহ বেড়িবাঁধ বলেশ্বর নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং নদী শাসনের বিষয়টি খুবই জোরালো হয়ে উঠেছে। নদী শাসনের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

সিইআইপি প্রজেক্ট খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল আলম মুঠোফোনে বলেন, শরণখোলার বগী এলাকায় ১ কিলোমিটারসহ পুরো প্রজেক্টে ৯ কিলোমিটার নদী শাসনের প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে নদী শাসনের কাজ শুরু করা হবে। তিনি আরো বলেন, বগী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতায় নতুন করে ডিজাইন ও জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আরো দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরুর তিন বছরে ৩৫/১ পোল্ডারে ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।

তালায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর

মানবেতর জীবন যাপন

 

তালা (সাতক্ষীরা):এ দিন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় জনপদ। এর আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। গৃহহারা হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। সমুদ্রে মাছ ধরারত বহু জেলের আর স্বজনদের কাছে ফেরা হয়নি। ১১ বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার সাতজন লোক নিহত হয়, আহত হয় শতাধিক লোক। দুবলারচর ও আলোরকোল নামক স্থানে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত হয় তালা উপজেলার মালোপাড়ার গৌর হালদার, অজিত হালদার এবং বাউখোলা গ্রামের বাসিন্দা গোবিন্দ বিশ্বাস। এ ছাড়া উপজেলার জাতপুর গ্রামের নূর বেগম, জালালপুরের ফেলি বিবি, টিকারামপুর গ্রামের হাসান গাজী এবং মাগুরা বাজারে অজ্ঞাত ব্যক্তি। নিহত পরিবারগুলোর অনেকেই না খেয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কোনো মতে দিন কাটাচ্ছে। তাদের খোঁজ এখন কেউ রাখে না। পরিবারগুলো মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি: প্রতিবারের মত এবারো বরগুনা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সামাজিক সংগঠন সিডর দিবসের শোক র্যালি সকাল টায় শহর প্রদক্ষিণ করবে, সাড়ে ৮টায় নলটোনার গণকবরে নিহতদের স্মরণে পুষ্পঅর্পন এবং গর্জনবুনিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে সকাল সাড়ে ৯টায় আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মনোয়ার সিডর দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।

আমতলী (বরগুনা):সিডরে নিহতদের স্মরণে আমতলীর ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ পিপলস ভয়েস অব আমতলী-পিভিএ সন্ধ্যা ৬টায় নুরজাহান ক্লাবের সামনে আয়োজন করেছে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও র্যালি আলোয় আলোয় কাটুক আধার।  

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর):বলেশ্বর নদ তীরের সিডরের উত্সমুখ ক্ষেতাছিড়া গ্রামে সিডরের জলোচ্ছাসের ক্ষত নিয়ে বিধ্বস্ত বাঁধ কোন মতে টিকে আছে। বাবুরহাট থেকে ক্ষেতাছিড়া হয়ে কচুবাড়িয়া পর্যন্ত নদী তীরের প্রায় চার কিলোমিটার বাঁধ এখনও যথাযথভাবে সংস্কার হয়নি। ক্ষেতাছিড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে হাজিগঞ্জ বাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার বিপর্যস্ত সড়কটি আজো পাকা হয়নি। জেলে অধ্যুষিত এ গ্রামের মানুষের বাঁধ ধসের আতঙ্ক আজও কাটেনি।