বেতন বৈষম্যের অভিযোগ তুলে টানা তৃতীয় দিনের মতো সাভারে চলছে শ্রমিক বিক্ষোভ। মঙ্গলবার শিল্পাঞ্চলটির বেশ কিছু তৈরি পোশাক কারখানার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ, কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ ও সড়কে অগ্নিসংযোগ করেছে। পুলিশ তাদেরকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং গুলির ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে সাভার পৌর এলাকার আনলিমা ডাইং লি. এর এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহত শ্রমিকের নাম মো. সুমন খাঁ (২৩)। তিনি শেরপুর জেলার শ্রীপদী থানার কলাকান্দা গ্রামের আমির আলী খাঁর ছেলে। সাভার পৌর এলাকার টানগেন্ডার তাইজুল ইসলামের বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিলেন।
সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশসহ আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন। সকাল থেকেই সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় এ শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে এসব এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
টায়ার জ্বালিয়ে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ। ছবি: ইত্তেফাক
পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় বাগবাড়ি এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের শামস স্টাইলিং ওয়্যারস লিমিটেডের শ্রমিকরা সকালে কারখানার কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দীপ্ত এ্যাপারেলস কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। পরে তারা হেমায়েতপুর-শ্যামপুর সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া করে। এসময় শ্রমিকরা বিভিন্ন রাস্তার মোড় ও অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইট পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে এসময় পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটের মুখে টিকতে না পেয়ে পিছু হটে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
বিমান বন্দর সড়কে শ্রমিকরা। ছবি: ফোকাস বাংলা
এরপর দুপুর ২টায় এ ঘটনার জের ধরে সাভার পৌর এলাকার উলাইল বাসস্টান্ডে অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের অপর একটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে অবস্থান নেয়। শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে পুলিশ রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও গুলি নিক্ষেপ করে। এসময় দুপুরের খাবার খেয়ে পার্শ্ববর্তী আনলিমা ডাইং লি. পোশাক কারখানার শ্রমিক মো. সুমন মিয়া বাইসাইকেল করে কারখানায় ফেরার পথে দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। এসময় শ্রমিক সুমন বুকের বামপাশে আঘাতপ্রাপ্ত হলে সড়কের উপর লুটিয়ে পড়েন। অন্য শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শরিফুল ইসলাম সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরো পড়ুন: বিভাগীয় শহরে হবে ১০০ শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
পুলিশের গুলিতে শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এমন খবর আনলিমা ডাইং লি. কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এসময় তারা একযোগে কারখানা থেকে বের হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা চালায়। পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশের লাঠিচার্জে ১০ জন পোশাক শ্রমিক আহত হয়। আহতদের সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের এ্যাকশন। ছবি: ইত্তেফাক
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমজাদুল হক বলেন, নিহত শ্রমিককে মৃত অবস্থায়ই হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার বুকের বাম পাশে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। ক্ষতটি গুলির কিনা তা ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। মৃতদেহটি পুলিশে কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করেছে।
সাভার ট্যানারি ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক গোলাম নবী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে সড়কের অবস্থান নিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। পুলিশ তাদেরকে বাধা দিলে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুরো শিল্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে।
ইত্তেফাক/জেডএইচ