নওয়াব ফয়জুন্নেছার বাড়ি হচ্ছে উন্মুক্ত জাদুঘর

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি উন্মুক্ত জাদুঘর হিসেবে নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এজন্য বাড়ির চার একর ৫৩ শতক জায়গা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কুমিল্লাস্থ কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও এলাকায় ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। অন্ধকার যুগে নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রপথিক নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নারীদের জন্য উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী ও আরফান্নেছা চৌধুরাণীর প্রথম কন্যা। তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। নারী জাগরণের অগ্রদূতখ্যাত বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে ১৮৭৩ সালে এই নারী নওয়াব কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়, যা বর্তমানে ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। ১৯০১ সালে লাকসামে ফয়জুন্নেছা ডিগ্রি কলেজ ও বিএন হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। নারী স্বাস্থ্যসেবায় তিনি ১৮৯৩ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেছা মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ১৮৯৯ সালে দেশের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নির্মাণ কাজে তত্কালে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। এ ছাড়া দাতব্য চিকিত্সা কেন্দ্র, পুল, ব্রিজ, কালভার্ট ও মসজিদ নির্মাণ করেন। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ছিলেন একজন সাহিত্যানুরাগী। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম কবি। তাঁর রচিত রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। এ ছাড়াও ফয়জুন্নেছার সংগীতসার ও সংগীত লহরী নামে দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়।

রানী ভিক্টোরিয়া ১৮৮৯ সালে ফয়জুন্নেছাকে ‘নওয়াব’ উপাধি দিয়েছিলেন। নারী শিক্ষার প্রসারে অনন্য ভূমিকার পরও নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীকে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। অবশ্য ২০০৪ সালে ফয়জুন্নেছাকে যৌথভাবে একুশে পদক দেওয়া হয়। কুমিল্লার লাকসাম শহর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পশ্চিমগাঁও-এ ডাকাতিয়া নদীর তীর ঘেঁষে নওয়াব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক নবাববাড়ির অবস্থান। ঐতিহ্যমণ্ডিত এ বাড়িটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় তা বিলীনের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন এ সম্পত্তির বড় একটি অংশ কৌশলে একটি মহল নিজেদের দখলে নিয়েছে। এ অবস্থায়ই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন সর্বমোট ৪ একর ৫৩ শতক সম্পত্তি বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরকে সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

‘নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী’ গ্রন্থের লেখক গবেষক অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক বলেন, ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর স্মৃতি রক্ষায় দীর্ঘদিনের দাবির কারণে বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের অধীনে গেছে। এতে আমরা আনন্দিত। আশা করি এটি একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কুমিল্লাস্থ কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোঃ আতাউর রহমান বলেন, নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী বাংলাদেশের নারী সমাজের বিস্ময়। তিনি সমাজহিতৈষী এবং সাহিত্যিক ছিলেন। তার স্মৃতি রক্ষায় লাকসাম নওয়াব বাড়িটিকে সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে। আমরা সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাড়িটিকে সহসাই উন্মুক্ত জাদুঘর এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।