একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ ইশতেহারের বক্তব্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি ছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক, সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতি নির্মূল করে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে সুসংহত করার অঙ্গীকার। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরেও বিভিন্ন সভাসমিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্বার তুলে ধরেছেন এবং তিনি উল্লেখ করেছেন জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান অব্যাহত থাকবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই সম্প্রতি দেশে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং তাতে বিপুলসংখ্যক মাদক পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্তদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে থেকে জানা গেছে, তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতালাভের পর মাদকবিরোধী অভিযানের তীব্রতা আরও বাড়ানোর নির্দেশ এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দফতর থেকে।
দেশের উন্নয়ন যেভাবে চলছিল তাতে মাদক দেশের উন্নয়নে অন্যতম বাধা বলে মনে করছে বর্তমান সরকার। তাই এই বাধা দূর করতে মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলার কথা ঘোষণা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেইসাথে মাদকসহ গ্রেপ্তারকৃতরা এবং মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে জামিনে ছাড়া না পায়, এজন্য নানা কৌশল নেওয়া হচ্ছে। সরকার মাদক নির্মূলে শতভাগ আন্তরিক এবং এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডি যৌথভাবে একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিল। ফলে, দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের তীব্রতা বাড়ছে। সেইসাথে মাদক বিক্রেতা, মাদকের বড় বড় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যদের পৃথক পৃথক তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মাদকের সঙ্গে মানিলন্ডারিং আইনে মামলার যোগসূত্র রয়েছে। তাই মাদকের বিষয়টি বর্তমান সরকারের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। সম্প্রতি সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছে, সেটি হলো: এখন থেকে সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে প্রার্থীদের ডোপ টেষ্ট বা মাদক পরীক্ষা করা হবে। যাদের ডোপ টেষ্ট পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ হবে, তিনি চাকরির জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—মাদকাসক্তি থেকে তরুণদের রক্ষা করা। এটা আমাদের সকলের জন্য খুশির খবর। বিশেষ করে তরুণ যুবসমাজকে রক্ষা করতে মাদক বিরোধী অভিযানের বিকল্প নেই। সেইসাথে মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। সরকারি হিসাব মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ, আগামী ২০২০ সালনাগাদ এ সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে। যদিও প্রকৃতপক্ষে দেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। দিনকে দিন মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটি ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করা না গেলে মাদক দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তবে এতো অভিযানের পরেও মাদক পাচার এবং মাদক ব্যবসায়ীদের তত্পরতা দেশে এবং দেশের বাইরে যে অব্যাহত আছে তা সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায়। যেমন, কলম্বোয় গত ৩১ ডিসেম্বর ২৭২ কেজি হেরোইন, ৫ কেজি কোকেনসহ ধরা পড়েন দুই বাংলাদেশি। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসে মাদকের সবচেয়ে বড় চালান আটকের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ছয় বাংলাদেশি নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা এখন কলম্বোয় নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন। বাংলাদেশি আরও কয়েকজন নাগরিক কলম্বোয় মাদক চোরাচালানে জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করছে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
n লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি , মানস (মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা)
সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স