আমাদের তারুণ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ বিবেক

শিহাব উদ্দিন

আমাদের যুগে আছে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, একটি বিষয় একে অন্যকে জানানোর দ্রুততম মাধ্যম। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার আকর্ষণীয় সব মাধ্যম আমাদের হাতের নাগালে। কিন্তু আমাদের আসল জিনিসটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি—সেটা হলো বিবেক। আমি ঘুমন্ত বলব না কারণ ঘুমেরও একটা সীমা থাকে। সমপ্রতি ঘটে যাওয়া বেশকিছু ঘটনা আর আমাদের জনগণ তথা তরুণদের সেটার প্রতিক্রিয়া দেখে এটাই বলতে হয়। এসব ঘটনার একটি হলো ধর্ষণ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা স্বাধীন, সভ্য, শিক্ষিত ভাবতেও লজ্জা লাগে। আজ আমাদের মা-বোনরা যত্রতত্র নির্যাতিত, অপমানিত হচ্ছে আর আমরা সেটার প্রতিবাদ তো দূরে থাক বরং আচরণের বৈষম্য করছি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করে এসেও এসব শুধু দেখতে হচ্ছে বললে ভুল হবে বরং বলা ভালো আমরা এসব স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছি আর নিচ্ছি বলেই ভয়ানকভাবে তা বেড়েছে। বিচার হওয়া তো আকাশকুসুম চিন্তা। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার জন্য একটা শ্রেণি সবসময় সমাজটাকে নাচাচ্ছে। আর বাকি সবাই শাস্তি ভোগ করছে। এ অবস্থায় আমরা তরুণসমাজ আমাদের বিবেক হারিয়ে ফেলছি। আমাদের প্রতিবাদ করার যে ইতিহাস আছে সেটা আমরা ভুলতে বসেছি। আমাদের সহ্যক্ষমতা অত্যধিক বেড়েছে কিন্তু খারাপ ভাবে। আমরা নিজেরাই হয়ে পড়ছি অপরাধপ্রবণ। আর হয়ে যাচ্ছি অনলাইন, ফেসবুক কেন্দ্রিক। কিছু ঘটলেই অনলাইনে প্রচার করেই দায় সারছি, বাস্তবে প্রতিবাদ করার হিম্মতটুকুও মনে হয় আমাদের আর অবশিষ্ট নেই, যা আমাদের জন্য আত্মঘাতী। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে আমরা চরমভাবে দায়ী থাকব।

সরকার বা বিচার বিভাগকে জাগাতে হলে আমাদের তারুণ্যের শক্তি দিয়েই জাগাতে হবে। ধর্ষণের বিচারের ইতিহাস বাংলাদেশে দুঃখজনকভাবে খুবই করুণ। বেশিরভাগ ধর্ষক সমাজে কোনো না কোনো ভাবে প্রভাবশালী, তাই ধর্ষণের বিচারও দুষপ্রাপ্য। সামগ্রিকভাবে বিশেষ করে সরকারের চেতনার, বিবেকের উদয় হওয়া দরকার। কঠোর আইন প্রণয়ন করে তার সফল বাস্তবায়ন করা জরুরি। বর্তমান আইনে ধর্ষণের যে শাস্তির বিধান আছে যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০)-এর ধারা ৯-এ বর্ণিত শাস্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সেইসঙ্গে এই আইনে বর্ণিত মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে বাস্তবায়ন এবং আইনে বর্ণিত বিচারের সময় সীমা ৬ মাস থেকে কমিয়ে ১ মাস করা এখন সময়ের দাবি।

আইন প্রয়োগকারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সর্বস্তরে দায়িত্বশীল—যদি আইনের সত্যিকার রক্ষক হয় তাহলে সমাজ থেকে ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধগুলো দূর হবে। এমন আইন রক্ষাকারীকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয় যার কাছে রাষ্ট্রের জনগণ নিরাপদ নয়; কিন্তু যদি এমনটাই ঘটে তাহলে সে দায়ভার অবশ্যই নিয়োগকর্তাদের।

সর্বোপরি আমরা যারা তরুণ তারাই পারি এসব কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। শুধু অনলাইনে স্লোগান দিয়েই নিজের দায় না সেরে একটি বাস্তবিক আন্দোলন যা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেবে এমন কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা জাতির সেবা করতে পারি। আর এভাবেই হয়তো আমরা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বিবেকের অধিকারী হওয়া থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাব।

কুমিল্ল­া বিশ্ববিদ্যালয়