১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সাল, শুক্রবার। সুবেহ্ সাদিকের সময়। দেশের সব মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের আহ্বান ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল- 'নামাজের জন্য এসো', 'মঙ্গলের জন্য এসো' এবং 'ঘুম থেকে নামাজ উত্তম'। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশবিক সশস্ত্র ঘাতকরা মুয়াজ্জিনের সেই আহ্বান উপেক্ষা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে আক্রমণ করে। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে তার শিশুপুত্র রাসেল, বেগম মুজিবসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘাতকচক্র রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম 'বাংলাদেশ বেতার' দখল করে। সেখান থেকেই বেতারযন্ত্রে সদম্ভ প্রচারে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যার দায়দায়িত্ব বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকার করে।
বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমেদ ওই দিনই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। এরপর ২০ আগস্ট, ১৯৭৫ ইং তারিখে সামরিক আইন জারি করেন, সংবিধান বহাল রেখেই। ওই সামরিক আইনের কার্যকারিতা দেওয়া হয় ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ হতে। শর্ত ছিল সংবিধান কার্যকর থাকবে সামরিক আইনের ঘোষণা, সামরিক বিধি ও আদেশসমূহ সাপেক্ষে। এভাবে সংবিধানকে সামরিক আইন, সামরিক আদেশ ও বিধির অধীন করা হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ দখলদার রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদ 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৫' জারি করেন। ওই কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ'-এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অন্য সদস্যসহ ওই দিন সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি প্রদান করেন। শুরু হয় এক কালো অধ্যায়ের। ওই 'কালো অধ্যাদেশে' উল্লেখ করা হয় যে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ ওই সব হত্যা এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার লক্ষ্যে যেসব পরিকল্পনা, পদক্ষেপ বা সক্রিয় কার্য গ্রহণ এবং সংঘটিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা অন্য কোনো কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না। ওই অধ্যাদেশে আরও উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি কিংবা তার পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক ঘটনাসমূহে জড়িত সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিগণকে দায়মুক্তি প্রদান করবেন। এ মর্মে প্রদত্ত সার্টিফিকেটটি 'পর্যাপ্ত সাক্ষ্য' হিসেবে বিবেচিত হবে। এভাবে হত্যাকারীদের করা হয় দায়মুক্ত ও পুনর্বাসিত।
কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা সম্পর্কে কোনো মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। সামরিক শাসন ও জারিকৃত কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দেশে বিচারহীনতার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে লালন করে।
দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ২ অক্টোবর, ১৯৯৬ ইং তারিখে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের হত্যা সংক্রান্ত ধানমন্ডি থানার মামলা নং-১০(১০) ১৯৯৬ দায়ের করা হয়। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ বাতিল করে 'ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন, ১৯৯৬' (আইন নং-২১/১৯৯৬) পাস করা হয়। এই আইন ১৪ অক্টোবর, ১৯৯৬ ইং তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। সার্বভৌম সংসদে এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার সব বাধা দূর হয়।
'ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন, ১৯৯৬'-এ উল্লেখ করা হয় যে, "এই আইন বলবৎ হ'বার পূর্বে যে কোনো সময় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের অধীনে কৃত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো সার্টিফিকেট বা আদেশ-নির্দেশ অথবা অর্জিত কোনো অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা, অথবা সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষের জন্য সৃষ্ট কোনো দায়দায়িত্ব, যদি থাকে সেক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭ এর ধারা ৬-এর বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে না এবং উক্তরূপ কৃত কার্য, গৃহীত ব্যবস্থা, প্রদত্ত সার্টিফিকেট বা আদেশ-নির্দেশ বা অর্জিত অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা বা সৃষ্ট দায়দায়িত্ব উপ-ধারা (১) দ্বারা উক্ত অধ্যাদেশ রহিতকরণের সঙ্গে সঙ্গে এইরূপে অকার্যকর, বাতিল ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে যেন উক্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় নাই এবং উক্ত অধ্যাদেশের কোনো অস্তিত্ব ছিল না ও নাই।"
এরপর ধানমন্ডি থানায় দায়েরকৃত মামলা নং-১০(১০) ১৯৯৬ সূত্রে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হলে গ্রেপ্তারকৃত আসামি কর্নেল (বরখাস্তকৃত) শাহরিয়ার কবির এবং আসামি কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সৈয়দ ফারুক রহমানের পক্ষে তার মা মাহমুদা বেগম 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন, ১৯৯৬' এবং বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং জেলহত্যা সংক্রান্ত মামলা দুটির কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পৃথক পৃথকভাবে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করে। উভয় রিট পিটিশন একত্রে শুনানি হয়।
আদালতের সামনে রিট আবেদনকারীগণের আইনজীবীর মূল বক্তব্য ছিল-
(১) ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত অনুচ্ছেদ '৩ক' এবং '১৮'-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক;
(২) ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ আইনটিকে যেহেতু সংবিধানে ৫ম সংশোধনী দ্বারা অনুমোদন, সুরক্ষিত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেহেতু, সাধারণ কোনো আইন পাসের মাধ্যমে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের দ্বারা উপরোক্ত আইনটি বাতিল করা বেআইনি ও ক্ষমতা-বহির্ভূত এবং ওই আইন বাতিল করতে হলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের দ্বারা সংবিধান সংশোধন করা আবশ্যক;
(৩) যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে সাধারণ একটি আইন দ্বারা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল আইনসংগত হয়েছে, তথাপিও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, যা সংবিধানের অংশ হিসেবে বিবেচিত, তৎদ্বারা রিট আবেদনকারীরা যে দায়মুক্তির অধিকার অর্জন করেছে, তা কোনোভাবেই হরণ করা সংবিধানসম্মত নয়। এক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ধারা ৬-অনুযায়ী বাতিলকৃত আইন দ্বারা আবেদনকারীরা দায়মুক্তির যে অধিকার প্রাপ্ত হয়েছে, তা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না;
(৪) সংবিধান যেহেতু, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সুরক্ষা দিয়েছে, সেহেতু, আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হতে পারে না; সুতরাং ফৌজদারি মামলার কার্যধারা বাতিলযোগ্য।
এখানে উল্লেখ করা সংগত হবে যে, সংবিধানে ৫ম সংশোধনীর (বর্তমানে বাতিল ও অস্তিত্বহীন) মাধ্যমে সংবিধানের ৪র্থ তফসিলে দুটি অনুচ্ছেদ অর্থাৎ '৩ক' এবং '১৮' সংযোজন করা হয়। অনুচ্ছেদ ৩ক (১) ও (২) উল্লেখ করা হয় যে, ২০ আগস্ট ১৯৭৫-এ ঘোষিত সামরিক আইন সংক্রান্ত ঘোষণা, ০৮ নভেম্বর ১৯৭৫ এবং ২৯ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘোষণাসমূহ এবং ওই ঘোষণাসমূহের সকল সংযোজন, সংশোধন ও পরিবর্তন, সকল সামরিক বিধি, আদেশ এবং প্রণীত আইনসমূহ যা ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং উল্লেখিত ঘোষণা বাতিল এবং সামরিক আইন বাতিল-এর মধ্যবর্তী সময়ে প্রণীত হয়েছিল'- তা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং দেশের কোনো আদালত কিংবা ট্রাইব্যুনালে এসবের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
উল্লিখিত সময়কালে রাষ্ট্রপতি বা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কর্তৃক জারিকৃত আদেশ, আইনসমূহ বা কৃত অন্যান্য কার্যধারা এবং সামরিক আইনের ঘোষণা, বিধি বা উপরোক্ত আদেশসমূহে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অপর কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ বা দণ্ডাদেশ বা অন্যান্য সকল প্রয়োগকৃত ক্ষমতা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে এ সংক্রান্তে কোনোরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
অনুচ্ছেদ '১৮'-এ উল্লিখিত সময়ে প্রণীত সামরিক ঘোষণাসমূহ এবং এর সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন এবং ঐ সকল ঘোষণা, বিধি ও আদেশ-এর ক্ষমতাবলে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কৃত সকল আদেশ, কর্ম, দণ্ডাদেশকে 'অনুমোদন' (ratification) এবং সমর্থন দিয়ে উপরোক্ত বিষয়সমূহের বৈধতা নিয়ে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো অজুহাতেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না মর্মে বিধান করা হয়।
হাইকোর্ট বিভাগ উপরোক্ত সাংবিধানিক ও আইনি বিষয়গুলি নিষ্পত্তির জন্য তৎকালীন বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল কে. এস. নবী এবং ছয়জন অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য শ্রবণ করেন। ছয়জন অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে চারজন- সৈয়দ ইশতিয়াক আহম্মেদ, রফিকুল হক, ড. কামাল হোসেন, এম. আমীর-উল ইসলাম এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল কে এম নবীর বক্তব্য ছিল প্রায় এক ও অভিন্ন। তাদের বক্তব্য ছিল- (১) ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি ছিল সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২, ৪৬ এবং ৪৭-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সামঞ্জস্যহীন এবং অকার্যকর একটি আইন; (২) অকার্যকর একটি আইন কখনই সংবিধানের অংশ হতে পারে না এবং একটি অকার্যকর আইন কারও অনুকূলে কোনো 'অধিকার বা স্বার্থ (VESTED RIGHT) সৃষ্টি করতে পারে না; (৩) কোনো খুনিকে কখনও দায়মুক্তি দেওয়া যায় না; এবং (৪) একজন রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিরা দায়মুক্তি পেতে পারে না।
অ্যামিকাস কিউরি এম. নুরুল্লাহর বক্তব্য ছিল- 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ কোনো সামরিক ঘোষণা, রেগুলেশন বা আদেশ ছিল না। এটা ছিল একটি সাধারণ আইন, যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করেছিলেন। ওই অধ্যাদেশ যখন জারি করা হয় তখন সামরিক আইনের পাশাপাশি সংবিধানও বহাল ছিল। এ অধ্যাদেশ সংবিধানের কোনো অংশ ছিল না বা হতে পারে না এবং এটি একটি সাধারণ আইন হিসেবে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে পাসকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ ও সংবিধানসম্মত আইন।'
অন্য অ্যামিকাস কিউরি খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ-এর বক্তব্য ছিল- 'একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে ওই অধ্যাদেশটি জারি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর ফলে ঐ আইনটি সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, যা শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই পারেন পরিবর্তন বা বাতিল করতে, সাধারণ কোনো আইন দ্বারা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্বারা ওই আইন বাতিল করা যাবে না'।
সংশ্নিষ্টপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী ও বিজ্ঞ অ্যামিকাস কিউরিগণের বক্তব্য, আইন ও সংবিধান এবং প্রতিষ্ঠিত নীতি বিশ্নেষণে হাইকোর্ট বিভাগ সিদ্ধান্ত দেয় যে,
(১) ইনডেমনিটি (বাতিল) অধ্যাদেশ, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন এবং এটা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়;
(২) ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ (অধ্যাদেশ নং ৫০/১৯৭৫) একটি অকার্যকর আইন, কেননা এটা সংবিধানের সাথে বেমানান বা সামঞ্জস্যহীন ছিল;
(৩) ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ যেহেতু, সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল এবং ইনডেমনিটি (বাতিল) অধ্যাদেশ, ১৯৯৬ সংবিধানের কোনো বিধানকেই লঙ্ঘন বা বিক্ষুব্ধ করেনি, সেহেতু বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ধানমন্ডি থানা মামলা নং-১০(১০)১৯৯৬) এবং জেলহত্যা মামলা লালবাগ থানার মামলা নং ১১(১১)১৯৭৫ বেআইনি বা ক্ষমতা বহির্ভূত মর্মে প্রার্থিত ঘোষণার কোনো আইনি সুযোগ নেই; উপরন্তু জেলহত্যা মামলা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের আওতা-বহির্ভূত ছিল;
(৪) পাঁচজন বিজ্ঞ অ্যামিকাস কিউরি ও বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য- ''ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ আইনটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ইনডেমনিটি (বাতিল) অধ্যাদেশ আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন" -সঠিক ও আইনসম্মত।
ফলে রিট দুটি খারিজ হয়। তবে হাইকোর্ট বিভাগ রিট আবেদনকারীগণের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৩-এর বিধান অনুসারে আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের জন্য সার্টিফিকেট প্রদান করে।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সিদ্ধান্তের অংশে এসে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫’-কে ‘অকার্যকর একটি আইন হিসেবে’ অভিমত ব্যক্ত করলেও রায়ের গর্ভে এই আইনটিকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুযায়ী প্রণীত একটি বৈধ সাধারণ আইন হিসেবে উল্লেখ করেছে। হাইকোর্ট বিভাগ আরো অভিমত ব্যক্ত করে যে, ‘যেহেতু খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে, সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নয় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জারি করেছিলেন, সেহেতু, এটি একটি সাধারণ আইন’; সুতরাং এই আইন সংশোধন বা বাতিলের জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুসরণ অর্থাত্ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের সমর্থনে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই এবং সাধারণ আইন দ্বারা সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাতিল করা বৈধ। হাইকোর্ট বিভাগ রায়ে আরো অভিমত ব্যক্ত করে যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যেহেতু একটি অকার্যকর আইন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে, সুতরাং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ধারা-৬-এর বিধান অনুযায়ী রিট আবেদনকারীরা কোনো সুবিধা কেউ পাবে না—‘অর্জিত বা প্রাপ্ত অধিকারের’ অজুহাতে। (বি.এল.ডি. পৃষ্ঠা ১১৩, অনুচ্ছেদ ৬৪ ও ৮৭)।
আরো উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, এ মামলার শুনানিতে রিট আবেদনকারীগণের বিজ্ঞ আইনজীবীর জোরালো বক্তব্য ছিল যে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে।
ঐ বিপ্লবের ফলে সরকার পরিবর্তন হয় এবং একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪র্থ তপশিলে অনুচ্ছেদ ‘৩ক’ ও ‘১৮’ সংযোজনের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং ৯ এপ্রিল ১৯৭৯-এর মধ্যবর্তী সময়ের সব কর্ম ও কার্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে; সুতরাং এ কার্যসমূহকে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করার আদৌ কোনো সুযোগ নেই। প্রতিউত্তরে তত্কালীন অ্যাটর্নি জেনারেল কে এস নবীর বক্তব্য ছিল যে, ১৫ আগস্টের ঘটনা কোনো বিপ্লব ছিল না; সশস্ত্র বাহিনীর একটি গ্রুপ অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তত্কালীন রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে তাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। এটা রাষ্ট্রপতি এবং তার পরিবারবর্গকে খুনের একটি ঘটনা। অস্ত্রধারীদের সহায়তায় খন্দকার মোশতাক আহমেদ অবৈধ ও বেআইনিভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেছিল। তার সব কর্মকাণ্ড অবৈধ ও অসাংবিধানিক এবং আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর। সুতরাং, খন্দকার মোশতাক কর্তৃক জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইনের দৃষ্টিতে অস্তিত্বহীন, অকার্যকর, অসাংবিধানিক এবং আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলতে কোনো বাধা নেই।
হাইকোর্ট বিভাগ, দুই বিজ্ঞ আইনজীবীর উপরিউক্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে ‘আবেগতাড়িত বক্তব্য (emotional contentions)’ মর্মে অভিমত দেন। হাইকোর্ট বিভাগের অভিমত ছিল ‘যেহেতু সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল, সুতরাং এটি সংবিধানের অংশ ও বৈধ। হাইকোর্ট বিভাগ এটিকে ‘অতীত ও সমাপ্ত (past and close)’ বিষয় হিসেবে মন্তব্য করে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আরো উল্লেখ করা সংগত হবে যে, ৫ম সংশোধনীর বিষয়ে উপরিউক্ত মামলাসমূহে উক্ত সংশোধনীকে বৈধ মর্মে গ্রহণ করে রায় প্রদান করলেও এর প্রায় ১০ বছর পর (২৯.০৮.২০০৫) মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ ‘ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লি. বনাম বাংলাদেশ সরকার’ মামলায় সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ, বেআইনি ও অকার্যকর মর্মে ঘোষণা করেন, যা আপিল বিভাগও বহাল রাখে।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারীগণের দায়েরকৃত আপিলসমূহ আপিল বিভাগেও আপিল খারিজ হয়। তবে হাইকোর্ট বিভাগ ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অকার্যকর একটি আইন হিসেবে’ পাঁচ জন অ্যামিকাস কিউরি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে যে অভিমত দিয়েছিলেন তাকে আপিল বিভাগ ‘অযাচিত’ (uncalled for) হিসেবে আখ্যায়িত করে তা সমর্থনযোগ্য নয় বলে অভিমত দিয়েছে।
আপিল বিভাগের অভিমত ছিল ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫-এর আইনটিতে ‘অতি জাদুকরি (extra magic)’ কোনো বিষয় ছিল না। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুসারে ঐ আইন জারি করেছিলেন। সংসদে কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা সংবিধানের অংশে পরিণত হবে। সুতরাং, সাধারণ আইন হিসেবে বিবেচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বা পরিবর্তন অপর একটি সাধারণ আইন দ্বারা হতেই পারে; অতএব ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ থেকে ঘোষিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুতগতি লাভ করে। মোট ২০ জন আসামির বিরুদ্ধে ঢাকার দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২০বি/৩০২/৩৪ এবং ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
চার্জ গঠনের পর একজন আসামি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ০৮.১১.১৯৯৮ ইং তারিখের রায় প্রদান করেন। ঐতিহাসিক এই রায় ও আদেশে ১৯ জন আসামির মধ্যে ১৫ জন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সবাইকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রদান করেন। অন্যদের খালাস প্রদান করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী বিচারিক আদালত প্রদত্ত ‘মৃত্যুদণ্ড’ আদেশ অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হয়। হাইকোর্ট বিভাগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণ এই ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে বিব্রত বোধ করেন। তাদের এমন অপ্রত্যাশিত মানসিকতা কিছুটা হলেও সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কতিলক এঁকেছিল। অবশেষে মাননীয় বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ও মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এই ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়। শুনানি শেষে বেঞ্চের একজন মাননীয় বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন এবং একজন আসামির দণ্ডাদেশ পরিবর্তন এবং পাঁচ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খালাস প্রদান করেন। কিন্তু বেঞ্চের অপর মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জন আসামিরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে তা অনুমোদন করেন। এর ফলে সংগত কারণে ডেথ রেফারেন্সটি তৃতীয় বেঞ্চে গড়ায়। তৃতীয় বেঞ্চের বিচারক হিসেবে মাননীয় বিচারপতি ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশের সাজা বহাল রেখে তিন জনকে খালাস প্রদান করেন।
এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক দণ্ডিত পাঁচ জন পৃথক পৃথকভাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ পিটিশন’ দাখিল করলে আপিল বিভাগে ‘লিভ’ মঞ্জুর হয়। আপিল বিভাগ দণ্ডিতদের পক্ষে উপস্থাপিত পাঁচটি আইনি বিষয় বিবেচনার জন্য লিভ মঞ্জুর, যা ছিল—‘‘(১) হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চের দুই জন বিচারক ভিন্নমত পোষণ করে পৃথক পৃথক রায় প্রদান করায় তৃতীয় বিচারক পূর্ণাঙ্গভাবে অর্থাত্ সব সাজাপ্রাপ্তের বিষয়ে ডেথ রেফারেন্সটি শুনানি গ্রহণ না করে শুধু ছয় জন সাজাপ্রাপ্তের রেফারেন্স শুনানি করে আইনগত ভুল করেছে; (২) ‘দীর্ঘ বিলম্বে অর্থাত্ ২১ বছর পর রাষ্ট্রপক্ষ অসত্ উদ্দেশ্যে ও পরিকল্পিতভাবে মনগড়া গল্প তৈরি করে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে’—কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগ এ বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড’ দিয়ে চরম ভুল করেছে; (৩) ‘সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সেনা বিদ্রোহের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন’—এটা সাধারণ বা প্রচলিত কোনো খুন নয়; সুতরাং প্রচলিত আদালতে এ খুনের বিচার এক্তিয়ারবহির্ভূত ও বিচার কার্যক্রমকে কলুষিত (vitiated) করেছে; (৪) রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উত্থাপিত সাক্ষ্যসমূহ প্রমাণ করে না যে, হত্যাকে সংঘটিত করার জন্য কোনো ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল, বরং সামরিক বিদ্রোহ হয়েছিল মুজিব সরকারকে পরিবর্তনের জন্য; (৫) রাষ্ট্রপক্ষ দণ্ডিত আপিলকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপনে এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, তারা দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় কোনো অপরাধ সংঘটিত করেছে এবং সে কারণে হাইকোর্ট বিভাগ আপিলকারীদের দণ্ড ও সাজা বহাল রেখে মারাত্মক ভুল এবং আইনের অপপ্রয়োগ করেছে।”
এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে আপিল বিভাগে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের শেষ ধাপ থমকে যায়। আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ না দিয়ে কৃত্রিমভাবে বিচারকসংকট তৈরি করে রাখা হয়। বিশেষভাবে নিযুক্ত আইনজীবী বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৯ সালে আবারও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে আপিল শুনানি সম্ভব হয়। আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর দণ্ডিত আপিলকারীদের পক্ষে উত্থাপিত আইনগত প্রশ্নসমূহ সম্পর্কে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত ও অভিমতসমূহ প্রদান করে আপিলসমূহ খারিজ করে দেয়—“(১) ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৭৪ ও ৪২৯ অনুসারে তৃতীয় বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারক সম্পূর্ণ এক্তিয়ার রাখেন যে, ‘তিনি বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়ের ওপর শুনানি করবেন’; সুতরাং তৃতীয় বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারক হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারকগণ যে ছয় জন আসামির বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন শুধু তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কোনো ভুল করেননি; (২) বিজ্ঞ দায়রা জজ এবং হাইকোর্টের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ দীর্ঘ বিলম্বে এজাহার দায়ের সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যা ও সাক্ষ্য পর্যালোচনায় যে সিদ্ধান্ত একযোগে দিয়েছেন তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই; শুধু বিলম্বে এজাহার দায়েরের কারণে প্রসিকিউশন অর্থাত্ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই; বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও পরিস্থিতির কারণে এজাহার দায়েরে বিলম্ব হতেই পারে; (৩) আর্মি অ্যাক্ট-১৯৫২-এর ধারা ৫৯(২) অনুসারে ঐ আইনের অধীনে খুনের ঘটনা বিচার তখনই হবে যদি অপরাধীরা ‘সক্রিয় চাকরিরত’ থাকে; কিন্তু আসামিরা আর্মি অ্যাক্টের ধারা ৮(১) অনুসারে ‘চাকরিতে সক্রিয়’ ছিল না বিধায় প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে তাদের বিচারে কোনো বাধা ছিল না; দ্বিতীয়ত যদি এটা ধরেও নেওয়া হয় যে, আর্মি অ্যাক্টের ধারা ৮(২) অনুসারে এটা একটি ‘দেওয়ানি অপরাধ’ (সিভিল অফেন্স) তথাপি ঐ আইনের ধারা ৯৪ অনুসারে প্রচলিত আদালতে বিচারে কোনো বাধা নেই; (৪) আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য পর্যালোচনায় এ সিদ্ধান্তে আসার কোনো সুযোগ নেই যে, ‘সেনা বিদ্রোহের কারণেই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও অপর তিন জন নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল’; এটা ‘সেনা বিদ্রোহ’ সংঘটিত করার জন্য কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ছিল না, বরং ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রটি’ ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দকে হত্যা করার জন্য; (৫) হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ উপস্থাপিত সাক্ষ্য বিবেচনায় বিশ্বাস করেছেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে সক্ষম হয়েছে; অন্যদিকে দণ্ডিত আপিলকারীগণ এটা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে যে, হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণে ও বিবেচনায় ‘গুরুতর কোনো ভুল’ বা ‘অবিচার’ করেছে—যাতে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত ও আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে; (৬) দণ্ডিত আপিলকারীগণ আদালতের সামনে এমন কোনো ‘বিশেষ বিষয়’ বা ‘প্রেক্ষাপট’ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি যার ভিত্তিতে তাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হ্রাস করা যেতে পারে এবং সে কারণে দায়রা আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ‘মৃত্যুদণ্ডের’ সাজা যা ডেথ রেফারেন্সে হাইকোর্ট অনুমোদন দিয়েছে—তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।”
‘বিলম্ব কোনো অপরাধীর বিচারে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না’—এই আইনি নীতিটি আবারও স্বীকৃতি পায়। বিচার চাইবার অধিকার সাংবিধানিক ও সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃত অধিকারকে স্বৈরাচারী কোনো অধ্যাদেশ দ্বারা রুদ্ধ করা যায় না। আপিল বিভাগের রায়ের পর পরই কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয় ২৮ জানুয়ারি, ২০১০-এ। সাম্প্রতিক সময়ে আরো এক জন দণ্ডিতকে গ্রেফতার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে; অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বিলম্বে হলেও জাতির জনকের হত্যার বিচারে অর্পিত সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। (গতকালের পর শেষাংশ)
লেখক : বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট,
হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান,
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ