বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের সিন্ডিকেট কবে ভাঙিবে?

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০৪:২৮

আমাদের মানবিক উৎকর্ষ কেবল তাহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দ্বারা নির্ণীত হয় না। প্রকৃতি, পরিবেশ ও নির্বাক প্রাণিকুলের প্রতি তাহার আচরণের মধ্য দিয়াও মনুষ্যজাতির অন্তর্নিহিত পরিচয় প্রকাশ পায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের যেই ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পাইতেছে, তাহা কেবল আইন ভঙ্গের ঘটনা নহে—ইহা প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের নির্মম আগ্রাসনের এক বেদনাদায়ক দলিল । পত্রিকান্তরে প্রকাশিত ‘বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের নেপথ্যে সিন্ডিকেট' সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে— গাজীপুরের বনাঞ্চল হইতে ফাঁদ পাতিয়া ময়না-টিয়াসহ বিভিন্ন পাখি আটক, অনলাইন মাধ্যমে বিক্রির আয়োজন, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক হইতে বিপন্ন প্রজাতির রিংটেইল লেমুর চুরি ও বিদেশে পাচারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইহার নেপথ্যে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী চক্র নহে, বরং দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রহিয়াছে। সাম্প্রতিক অভিযানে গাজীপুরে ১৫টি ময়না ও একটি টিয়া পাখি উদ্ধার এবং দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনা এই অন্ধকার জগতের সামান্য একটি অংশ মাত্র উন্মোচন করিয়াছে । আরো উদ্বেগের বিষয় হইল, প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করিয়া বন্যপ্রাণী ব্যবসার নতুন বাজার সৃষ্টি হইয়াছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরমে বিরল পাখি ও প্রাণীর ছবি প্রদর্শন করিয়া ক্রেতা সংগ্রহ করা হইতেছে । মিনি চিড়িয়াখানা কিংবা বৈধ পাখি ব্যবসার আড়ালেও কোথাও কোথাও চলিতেছে অবৈধ বন্যপ্রাণী কেনাবেচা। অর্থলোভী মানুষের কাছে একটি প্রাণীর স্বাধীনতা, পরিবেশগত গুরুত্ব কিংবা জীবনের মূল্য যেন কেবল টাকার অঙ্কে পরিণত হইয়াছে।

বন্যপ্রাণী পাচারকে অনেক সময় সাধারণ চোরাচালান বলিয়া দেখিবার প্রবণতা রহিয়াছে; কিন্তু বাস্তবতা হইল, ইহা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গুরুতর অপরাধ । একটি প্রাণী যখন তাহার স্বাভাবিক আবাসস্থল হইতে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন শুধু একটি জীবনই বিপন্ন হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র প্রতিবেশব্যবস্থা। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী একটি বৃহৎ জীববৈচিত্র্য-শৃঙ্খলের অংশ। সেই শৃঙ্খলের একটি অংশ বিনষ্ট হইলে তাহার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পরিবেশের ভারসাম্যের উপর । গাজীপুর সাফারি পার্ক হইতে দুর্লভ রিংটেইল লেমুর চুরির ঘটনা এই অপরাধের ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করিয়াছে। একটি সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করিয়া বিপন্ন প্রাণী পাচার করিতে পারা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। অভিযোগ উঠিয়াছে, অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও পাচারকারী চক্রের সমন্বয়ে এই অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে। ইহা প্ৰমাণ করে, কেবল বাহিরের অপরাধী নহে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থার ভিতরেও দুর্বলতা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিআইডি ও বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ইতিমধ্যে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। পাচার হওয়া প্রাণী উদ্ধারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতাও চাওয়া হইয়াছে । তবে কয়েক জন অপরাধীকে গ্রেফতার করিলেই এই সমস্যার সমাধান হইবে না । এই অপরাধের মূল হোতা, অর্থের উৎস, আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাজারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ভাঙিয়া দিতে হইবে ।

বস্তুত, খাঁচাবন্দি পাখির সৌন্দর্য উপভোগের মানসিকতাই অনেক ক্ষেত্রে এই অবৈধ ব্যবসাকে উৎসাহিত করে । মানুষকে বুঝিতে হইবে–পাখির সৌন্দর্য খাঁচায় নহে, তাহার মুক্ত জগতে। বন্যপ্রাণীর মর্যাদা প্রদর্শনীতে নহে, তাহার আপন আবাসভূমিতে। মনে রাখিতে হইবে, প্রকৃতি মানুষের সম্পত্তি নহে । মানুষ প্রকৃতিরই একটি অংশমাত্র । সুতরাং বন, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কোনো দয়ার কাজ নহে—ইহা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য দায়িত্ব। এমতাবস্থায় বন্যপ্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, সীমান্ত ও বিমানবন্দরে নজরদারি বৃদ্ধি, অনলাইন বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধী সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন জরুরি । ইহা ব্যতীত বন্যপ্রাণী পাচার বন্ধের কোনো উপায় নাই। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব । সুতরাং মানুষকে চলিতে হইবে তাহার বিবেক দিয়া। সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান প্রাণী বিধায় বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করা মানুষের বৌদ্ধিক দায়িত্বও বটে ।

ইত্তেফাক/এনএন