বিদ্যুত্ অতিপরিবাহী পদার্থ উদ্ভাবন

কেবলের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত্ চলাচলের সময় বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়। এ কারণে অপচয় হয় উল্লেখযোগ্য অংশের বিদ্যুত্। কিন্তু বিদ্যুত্ চলাচলের সময় অপচয় রোধ করতে এবার ‘বিশেষ পদার্থ’ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ ঐ পদার্থ উদ্ভাবনের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’-এ। গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থ বিজ্ঞানী রাসেল হেমলে।

ভূ-পদার্থ বিজ্ঞানী হেমলে জানিয়েছেন, ল্যান্থানাম মৌলের সঙ্গে হাইড্রোজেন মৌলকে যুক্ত করেই তৈরি করা হয়েছে এই অতিপরিবাহী পদার্থটি। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’। যা ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও অতিপরিবাহী হয়ে ওঠে। গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেক চেষ্টা করেও এ্ই ধরনের অতিপরিবাহী পদার্থ উদ্ভাবন করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

‘ল্যান্থনাম হাইড্রাইড’ উদ্ভাবনের পর সবাই নড়েচড়ে বসার বিশেষ কারণ রয়েছে। এটি এমনই একটি পদার্থ যেটি কিনা সুপার কন্ড্রাক্টর হিসেবে কাজ করবে। তবে সুপার কন্ড্রাক্টর সাধারণত বিশেষ তাপমাত্রাতেই অতিপরিবাহী ধাতুর কাজ করতে পারে। আর সুপার কন্ড্রাক্টরকে বিশেষ তাপমাত্রায় রাখাটা ব্যয়বহুল। কিন্তু নতুন উদ্ভাবিত ‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’ যে কোন তাপমাত্রাতেই সমান কার্যকরী। ফলে এর জন্য বাড়তি খরচের প্রয়োজন পড়বে না। ম্যাগনেট ট্রেনে চৌম্বকীয় শক্তির মাধ্যমে কোন বস্তুকে শূন্যে উত্তোলন করে চাকা, এক্সেল কিংবা বিয়ারিং ছাড়াই সামনের দিকে চালনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে যানবাহনকে ভূমি থেকে সামান্য উপরে উঠিয়ে চৌম্বক শক্তির মাধ্যমেই সামনের দিকে ধাক্কা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে নিচে ব্যবহূত ধাতুকে সুপার কন্ড্রাক্টর হতে হয়। তবে তার জন্য এই সুপার কন্ড্রাক্টর ধাতুকে বিশেষ তাপমাত্রায় রাখতে হয়। কিন্তু নতুন উদ্ভাবিত ‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’র ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। ফলে অনায়াসেই এই ধাতু ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

এছাড়া এই পদার্থ দিয়ে তৈরি কেবল দিয়ে বিদ্যুত্ পরিবহন করলে উত্পাদিত বিদ্যুতের পুরোটাই ব্যবহারযোগ্য হবে। বিদ্যুত্ পরিবহনে কোন অপচয় না হওয়ার কারণ ওই অতিপরিবাহী পদার্থের ভেতর দিয়ে বিদ্যুত্ চলাচলে কোন বাধা দেবে না। অপচয় না হওয়ার কারণে বিদ্যুতের উত্পাদন খরচও অনেকটা কমে যাবে। এমনকি মরুভূমিতে সূর্যালোক বেশি বলে সেখানে উত্পাদিত সস্তার সৌর বিদ্যুত্ বহু দূরের এলাকায় পৌঁছে দেওয়া যাবে অপচয় ছাড়াই। যা জলবিদ্যুত্ ও তাপবিদ্যুতের উত্পাদন কমাতে সহায়ক হবে। এর ফলে যেমন চাপ কমবে নদীর ওপর, তেমনই তা উষ্ণায়নের আশঙ্কাও কমিয়ে আনবে।

‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’ উদ্ভাবনে গবেষকদের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও অতিপরিবাহী হয়ে ওঠে। বিদ্যুত্ চলাচলে বিন্দুমাত্র বাধা দেয় না। এই আবিষ্কারের নজর কাড়ার কারণ, শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উপরে এই প্রথম কোনো পদার্থকে অতিপরিবাহী হয়ে উঠতে দেখা গেল।

‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’ তৈরিতে ১০টি ল্যান্থানাম পরমাণুর সাথে ১০টি হাইড্রোজেন যুক্ত হয়েছে। তবে ‘ল্যান্থানাম হাইড্রাইড’ তৈরির কাজটি খুব সহজ ছিল না। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ল্যান্থানাম পরমাণুর সঙ্গে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে জোড়া বাঁধানোর জন্য বাইরে থেকে প্রচুর চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে। যে চাপের পরিমাণ ২০০ গিগা-পাসকাল বা বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চাপের ২০ লক্ষ গুণ! ওই প্রচণ্ড চাপে ল্যান্থানাম হাইড্রাইডের অণুকে এত জোরে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে যে, সেই যৌগে ল্যান্থানাম ও হাইড্রোজেনের হাতগুলো আকারে ছোট হয়ে গিয়েছে। তার ফলেই যৌগটি হয়ে উঠেছে অতিপরিবাহী। তাতে দেখা গিয়েছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওই পদার্থটি হয়ে ওঠে আক্ষরিক অর্থেই, অতিপরিবাহী।

মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর)-এর কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক, ভাটনগর পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী প্রতাপ রায় চৌধুরী বলছেন, অতিপরিবাহী পদার্থের গবেষণায় এই আবিষ্কারকে একটি মাইল স্টোন বলা যায়। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অতিপরিবাহী পদার্থের খোঁজ পাওয়ার জন্য ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু তেমন একটা সাফল্য আসেনি। এই আবিষ্কারের ফলে, এক দিন বিদ্যুত্ উত্পাদন, সরবরাহ ও তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।-আনন্দবাজার