শ্রমিক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ সাভারে নিহত ১

সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন ও বেতন বৈষম্য দূর করার দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, সাভার ও গাজীপুরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সভারের উলাইল এলাকার আন-লিমা গার্মেন্টসের সামনে বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন সুমন খাঁ (২৩)। তিনি ওই গার্মেন্টসেরই একজন কর্মী। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সহকর্মীরা তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন।

গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামোতে কোনো বৈষম্য বা অসঙ্গতি থেকে থাকলে চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা সংশোধন করা হবে। ফেব্রুয়ারিতেই সংশোধিত গ্রেডিংয়েই বেতন পাবেন শ্রমিকরা। টানা তিন দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ নিরসনে গতকাল শ্রম ভবনে আয়োজিত পোশাক শ্রমিক-মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যালোচনায় কমিটি করা হয়েছে।

আগের দুই দিনের মতো গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানীর উত্তরায় সকাল থেকেই বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। একই সময়ে দক্ষিণখান ও মিরপুরের কালশী এলাকায়ও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এসময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কালশী এলাকায় ২২ তলা গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

খাদিজা আক্তার নামে একজন নারী শ্রমিক বলেন, আমাদের ন্যূনতম বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন গত ডিসেম্বরে জারি হয়েছে। কিন্তু সেখানে আমাদের সব দাবি-দাওয়া উত্থাপন হয়নি। অপারেটর ও হেলপারের বেতনের মধ্যে অনেক বৈষম্য ও ব্যবধান রয়েছে। আমরা এগুলো দূর করার কথা বলছি। তিনি অভিযোগ করেন, তাদের জন্য সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করলেও মালিকপক্ষ তা দিচ্ছে না।

অপরদিকে, রাজধানীর উত্তরায় দক্ষিণখানে আটিপাড়ার এপিএস গার্মেন্টসের শ্রমিকরা সড়কে ভাঙচুর চালিয়েছে। এছাড়া চালাবন এলাকায়ও শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছে। সেখানে শ্রমিকদের বুঝিয়ে উঠিয়ে দেয় পুলিশ।

এ মাসেই বৈষম্যের সমাধান: শ্রমিক-মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সমস্যা সমাধানে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কমিটিতে গার্মেন্টস মালিকদের পাঁচ জন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের পাঁচজন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব থাকবেন। এই কমিটি চলতি মাসের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত বেতন কাঠামোর কোনো গ্রেডের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেবে।

এই বৈঠকে শ্রমিকদের আন্দোলন ছেড়ে নিজ নিজ কারখানার কাজে ফিরে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন নবনিযুক্ত বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী। তবে এরপরেও কেউ যদি রাস্তায় আন্দোলন করেন তাহলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এ বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নবনিযুক্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিক নেতারা বৈঠকের পর শ্রমিকদের রাস্তা ছেড়ে কাজে যাওয়ার আহবান জানান।

সাভারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রমিক নিহত: আমাদের সাভারের স্টাফ রিপোর্টার জানান, গতকাল সকাল থেকে সাভারের কয়েকটি স্থানে পুলিশ ও শ্রমিকদের পৃথক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় পুলিশসহ অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ তিন ব্যক্তি এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এছাড়া সুমন খাঁ নামে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিত্সক। মৃত অবস্থায়ই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার সাভারের কয়েকটি স্পটে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। সকালে হেমায়েতপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। পরে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে উলাইল এলাকার আন-লিমা গার্মেন্টসের সামনে বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন সুমন খাঁ (২৩)। তিনি ওই গার্মেন্টেরই একজন কর্মী। সহকর্মীরা তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। একই কারখানার শমেস নামের একজন শ্রমিক এবং সকালে হেমায়েতপুরের ঘটনায় আরও দুই নারী গুলিবিদ্ধ হয়ে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমজাদুল হক বলেন, ‘সুমন মিয়াকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পরই চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেছেন। তার বুকে গুলি লেগেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।’

এদিকে নিহত সুমন খাঁর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকা-১ আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পরিচালক সানা সামিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিকালের ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে শুনেছি। এখনো নিশ্চিত নই।’

এদিকে এনাম মেডিক্যালের অপারেশন থিয়েটার (ওটি)-এর ইনচার্জ ড. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘শমেস, আঁখি বেগম ও রুবিনা বেগম নামে তিন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছেন।’ আঁখি বেগম জানান, তিনি গার্মেন্টস কর্মী নন। হেমায়েতপুরে নিজের দোতলা বাসা থেকে সংঘর্ষের ঘটনা দেখছিলেন। সে সময় বাইরে থেকে একটি গুলি তার পেটে গিয়ে লাগে। রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের যমুনা গার্মেন্টসে কাজ করি। হেমায়েতপুরে সকালে বিক্ষোভের পর ঘটনাস্থলের পাশের কলোনিতে আমার বাড়িতে যাই। সেসময় পুলিশ ওই এলাকায় যায় এবং তাদের একটি গুলি আমার ডান পায়ে লাগে।’

তবে গুলি করার কথা অস্বীকার করেছেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।’

আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় প্রায় তিনটি কারখানার সামনে স্থানীয় সড়কে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদেরও ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় বলেও জানা গেছে।

গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ ভাঙচুর: আমাদের গাজীপুর  প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা গতকাল কর্মবিরতি, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। বিক্ষুব্ধরা শ্রমিকদের পুলিশের ব্যবহূত একটি মোটর সাকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শর্টগানের গুলি ও টিয়ার সেল ছুড়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া ও আশেপাশের এলাকার কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে আন্দোলন করছে বলে পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি।

আউটপাড়া এলাকার জোবেদা টাওয়ারের টিএন ফ্যাশনের অপারেটর সোহল জানান, গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে চান্দনা-চৌরাস্তার দক্ষিণে আউটপাড়া এলাকার শহীদ হুরমত আলীর কবরের পাশের ব্রাদার ফ্যাশন, ক্যাপিটাল ফ্যাশন কারখানার গেইটে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে তারা পাশের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নেমে গেলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় পুলিশ টিয়ার সেল মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বিক্ষোভ চলাকালে স্থানীয় টিএন ফ্যাশন, এপারেলস পোশাক কারখানা, পশমী সোয়েটার, ক্যাপিটাল ফ্যাশনসহ কয়েকটি কারখানা ছুটি দেয় কর্তৃপক্ষ।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের বাসন থানার ওসি মুক্তার হোসেন জানান, বিক্ষোভ চলাকালে উত্তেজিত শ্রমিকরা বাসন থানার ওসি (অপারেশন) নন্দলালের ব্যবহূত মোটর সাইকেলটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।