বর্ষার সময় নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যার পানি অনেকটাই ছিল পরিষ্কার ও টলমলে। তবে গত কয়েকদিন ধরে নদীর পানি আবার কালচে রঙ ধারণ করতে শুরু করেছে। ফের বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, নদীর তীরে দাঁড়ানোও বেশ কষ্টসাধ্য। নাকে রুমাল চেপেও দুর্গন্ধ আটকে রাখা যাচ্ছে না। নদীতে শুধু বিভিন্ন কল কারখানার বর্জ্য নয় বিভিন্ন এলাকার বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে। আর সেগুলোও ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ছে নদীতে।
ব্যবসায়ী সূত্র জানান, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ও আশপাশে অন্তত ২শ শিল্প কারখানাসহ ডাইং রয়েছে। এ ছাড়া নদী থেকে দূরে অনেক কারখানারও তরল বর্জ্যও ড্রেন দিয়ে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ সব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নদীতে ফেলা হচ্ছে। তার সঙ্গে এ নদীতে পড়ছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলির নাগরিক বর্জ্য। নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকার ৬০ বছর বয়সী রমজান মিয়া এ নদীতে এক সময় মাছ ধরতেন। তিনি জানান, তিনি ২০ বছর আগেও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ১৫/২০ বছর ধরে তিনি আর নদীতে মাছ ধরেন না। কারণ নদীর যে অবস্থা তাতে মাছ থাকাটা একেবারে অসম্ভব। সে কারণে এখন তিনি নৌকা চালান। আর নৌকা চালাতেও বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষাকালে দুর্গন্ধ কম থাকলেও শীতকালে বমি আসার উপক্রম হয়।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয়ক মোস্তফা করিম বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানাসহ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে শীতলক্ষ্যাকে দূষণ করছি। দূষণরোধে আমাদের সকল সরকারি দপ্তর, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প কারখানা মালিকদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’ শীতলক্ষ্যা দূষণরোধে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করা পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল জানান, আমরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করলেও কার্যত কোনো সুফল পাচ্ছি না। বরং দিন দিন দূষণ বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কারখানা স্থাপনের কারণেই এ দূষণ হচ্ছে। আমরা শুধু বক্তব্য, গোলটেবিল বৈঠক, সভা সেমিনার করে প্রতিবাদ জানালেও এগুলো রোধে এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক কারখানার ইটিপি তৈরি করা আছে। জরিমানা কিংবা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে ইটিপি নির্মাণ করে রাখলেও সেটা তারা ব্যবহার করে না। কারণ অনেক মালিকের দাবি, এটা ব্যবহার করলে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। সে খরচ বাঁচাতেই বিকল্প পাইপ দিয়ে অনেক ডাইং ও শিল্প কারখানা মালিক তাদের কেমিক্যালযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলছেন। আর রাতে এ কাজটি বেশি হয় বিধায় তাদের ধরা যাচ্ছে না। আমরা যখন দিনের বেলায় কারখানা পরিদর্শনে যাই তখন দেখানো হয় ইটিপি আছে। আর অনেক কারখানা এখন প্লান্টের পাশে বিশাল আকৃতির ট্যাংকি করে রাখে। এখানে দিনের বেলা বিষাক্ত পানি জমা করে রাখে যা সন্ধ্যার পর কিংবা গভীর রাতে নদীতে ছেড়ে দেয়। নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জে ৩৬৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে তরল বর্জ্য নিষ্কাশন হয়। এর মধ্যে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা ইটিপি আছে ২৪৭টির। ২৮৭টি ডাইং কারখানার মধ্যে ২৯টির ইটিপি নির্মাণাধীন। বাকি কারখানার দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে।