স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন বাড়ি আসবেন, পিতা-পুত্র লাশ হয়ে বাড়ি এলেন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এসি বিস্ফোরণে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নিহত মসজিদের মুয়াজ্জিন কাম ওয়াক্তিয়া নামাজের ইমাম হাফেজ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া (৪৭) শুক্রবার এশার নামাজের পূর্বে তার স্ত্রী ফাহমিদা আক্তারকে ফোন করে জানান, আমার এখানে ভালো লাগছে না। ২-১ দিনের মধ্যে বড় ছেলে অসুস্থ জোনায়েদ হোসেনকে (১৭) নিয়ে চাকুরি ছেড়ে একেবারে বাড়ি চলে আসবো। কিন্তু মুয়াজ্জিন কাম ইমাম হাফেজ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ছেলেসহ লাশ হয়ে শনিবার রাতে বাড়ি এলেন। 

এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ২১ জন নিহত ও বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ১৭ জন ভর্তি আছেন। তবে তাদের অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

নিহত হাফেজ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর মধ্যপাড়ার মৃত হাফেজ মাওলানা শফিকুর রহমানের ছেলে। পিতা-পুত্রের মৃত্যুতে গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম বইছে।

জানা যায়, হাফেজ দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার বড় ছেলে জোনায়েদ হোসেন (১৭) নিউ খানপুর হাসপাতাল রোড কাওমি মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণিতে এবং ২য় ছেলে হাফেজ জাকারিয়াকে (১৩) একই এলাকার জামেয়া হাজী সাইদুদ্দিন হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। দেলোয়ার হোসেন দুই ছেলেকে নিয়ে ওই এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করে আসছিলেন। নিহত হাফেজ দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া কালির বাজার আমলাপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে লেখাপড়া শেষ করে বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিগত প্রায় ২৫ বছর ধরে ইমামতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। 

সরেজমিনে পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাফেজ দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার পিতা মৃত মৌলভী শফিকুর রহমান ভূঁইয়াও একই এলাকার তল্লা বড় মসজিদে দীর্ঘ ৪০ বছর মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন। হাফেজ মৌলভী শফিকুর রহমান ৭ বছর পূর্বে মারা যান। বাবার কর্মস্থল সূত্রে ছেলে হাফেজ মাওলানা দেলোয়ার হোসেনও গত ২৫ বছর থেকে তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ইমাম কাম মুয়াজ্জিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার তিন মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৮), সুরাইয়া আক্তার (৮) ও ছোট মেয়ে ফাইজা আক্তারকে (৩) নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় আলীম ২য় বর্ষে অধ্যায়নরত, ২য় মেয়ে সুরাইয়া আক্তার একই মাদ্রাসার ৩য় শ্রেণির ছাত্রী। দেলোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়িতে ভিটে-মাটি ছাড়া কিছুই নেই। 

আরও পড়ুন: মসজিদে বিস্ফোরণে ইমামসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২১

দেলোয়ার হোসেন শ্যালক জোবায়ের হোসেন শনিবার দুপুর ২টায় এ প্রতিবেদককে বলেন, নিহত দেলোয়ার হোসেন ও তার ছেলে জোনায়েদ হোসেন এর লাশ গ্রহণ করার জন্য ঢাকা শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে অবস্থান করছেন। লাশ গ্রহণের পর নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার তল্লা জামে মসজিদ এলাকায় প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। পরে শনিবার সন্ধ্যায় নাঙ্গলকোটের ঢালুয়ার বদরপুরে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে।

ঢালুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাজমুল হাছান ভূঁইয়া বাছির জানান, হাফেজ দেলোয়ার হোসেন ও তার ছেলে জোনায়েদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করে যাবো। এ ছাড়াও তিনি অসহায় পরিবারটিকে সহায়তা করার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার লামইয়া সাইফুল বলেন, ‘দেলোয়ার হোসেন ও তার ছেলের লাশ গ্রামের বাড়িতে আসলে তাদের দাফনসহ পরিবারের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা এবং আমরা সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।’

ইত্তেফাক/এএএম