স্মরণ

আইনবিদ সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে পাশ্চাত্যে শিক্ষিত মুসলমান আইনজীবীর সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। অবিভক্ত বঙ্গে স্যার সৈয়দ আমীর আলী (৬ এপ্রিল ১৮৪৯-৩ আগস্ট ১৯২৮) কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলমান বিচারপতি নিযুক্ত হন ১৮৯০ সালে। এরপর তাঁর পুত্র সৈয়দ তারক আমীর আলীসহ আরো অনেক বাঙালি মুসলমান হাইকোর্টের বিচারপতি হন। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। তত্কালীন হাইকোর্টে বিচারপতি হিসাবে তাঁর এই সম্মানজনক আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে তখনকার সমাজে বাঙালি মুসলমানদের জন্য উচ্চ আদালতসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মোচিত হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্রে যেমন, তেমনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল অনেক প্রসারিত। তাই তো এক পর্যায়ে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হতে দ্বিধা করেননি। বিচারপতি-জীবনে তিনি অনেকগুলো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঐতিহাসিক, সময়োপযোগী রায় দিয়ে স্বৈরশাসনের মধ্যেও আইনের শাসন সমুন্নত রাখেন। অখণ্ড পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি আসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন। নির্ভেজাল গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি ছিলেন অবিচল প্রবক্তা।

একবার (১৯৬৪) পশ্চিমবঙ্গের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব পাকিস্তানে। বিচারপতি মোরশেদ হাইকোর্ট থেকে সুয়োমোটো (স্বাপ্রণোদিত রুল) জারি করলেন, যার ফলে এদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো আঘাত আসতে পারেনি। ১৯৬৬-তে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফার খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যে ৬ দফার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯-এ আইয়ুবের গোলটেবিল বৈঠকে তিনি ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট দাবি করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ওয়ান ইউনিট পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার পরে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এই অঞ্চলের ভোটেই পাকিস্তান গঠিত হয়। যে কারণে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন পূর্ব বাংলার প্রাপ্য। সেই হিসাবে এই অঞ্চলে যে দল বেশি আসন পাবে, সেই দলই কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের দাবিদার।