পাবনায় সবজি বিক্রিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাগড়া, ক্ষতিতে পাইকার ও চাষী

‘খেত থেকে  লাউ  তুলে  বাজারে নিলে দাগ পড়ে  নষ্ট হয়। দাগ পড়া লাউগুলো কেউ কিনতে চায় না। আবার বাজারে নিলে প্রতি লাউয়ের জন্য ৫ টাকা করে খাজনা দিতে হয়। তাই বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা  পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষেত থেকে সরাসরি ঢাকার ট্রাকে মাল দিতে শুরু করা হয়েছে। এখন হাটওয়ালারা বলছেন, বাজারে না নিলে নাকি লাউ বিক্রি করতে দেবেন না।’- আক্ষেপ, কষ্ট ও চাপা ক্ষোভ নিয়ে শনিবার কথাগুলো বলছিলেন, পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের লাউ চাষী  রেজাউল করিম। কেবল রেজাউলই নন, সবজি প্রধান পাবনার অধিকাংশ চাষীরাই এখন মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দাপটে অতিষ্ট। প্রতিদিনই উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিপণনে স্থানীয় বাজার ইজারাদারেরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে চলেছেন। এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন পাইকারাও, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রান্তিক চাষীরা। 

সরেজমিন, পাবনা সদর উপজেলার দিকশাইল, কালিকাপুর, আটমাইল, ছিলিমপুর, বক্তারপুর, আথাইলশিমুল, মুলাডুলি, আটঘড়িয়ার খিদিরপুরসহ জেলার অধিকাংশ সবজি প্রধান গ্রামগুলোর মাঠ  ছেয়ে গেছে সবুজ কচি লাউ আর সাদা ফুলে। চাষীরা ব্যস্ত ক্ষেতগুলোতে। 

চাষীরা জানান, করোনার ধকল আর পরিবহন সঙ্কটে ক্ষেতেই নষ্ট হয়েছে যতেœ বোনা সবজি। লোকসানের ধাক্কা না কাটতেই আবারও অতিবৃষ্টি। এমন সময় লাউয়ের ভালো ফলন ও দাম পেয়ে হাসি ফুটেছিল তাদের মুখে। তবে বাজার ইজারাদের হুমকিধামকি আর নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের মুখের হাসি ম্লান হতে বসেছে।

ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুরিয়া ইউনিয়নের আথাইলশিমুল গ্রামের লাউ চাষী সুরুজ আলী বলেন, ক্ষেত থেকে লাউ হাট কিংবা আড়তে নিতে পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যায়, টানা হেঁচড়ায় নষ্টও হয়। তাই পাইকারদের রাজি করিয়ে ক্ষেত থেকেই সরাসরি লাউ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। সতেজ ও পছন্দমত পণ্য পেয়ে খুশি পাইকাররাও।

আটঘড়িয়ার খিদিরপুর গ্রামের চাষী জানে আলম জানান, বাজারে লাউ নিয়ে গেলে ইজারাদাররা প্রতিটি লাউয়ের জন্য কৃষকের কাছ থেকে পাঁচ টাকা আবার পাইকারের কাছ থেকেও পাঁচ টাকা করে আদায় করে। ফাউ হিসেবে লাউ কেড়ে নেয়। আবার বাজার পর্যন্ত নিতে ভ্যান ভাড়া, সময় নষ্ট হয়। তাদের পুরো দিনটাই নষ্ট হয়। কিন্তু ক্ষেত থেকে সবজি নেওয়ায়  বাড়তি কোনো খরচ নেই, দ্রুত সবজি বিক্রি করে আবার ক্ষেতের পরিচর্যা বা অন্য কাজ করার সময় পাওয়া যায়।
গাজিপুর থেকে আসা পাইকার মাসুদ রানা জানান, কৃষকের অনুরোধে মাস খানেক ধরে তারা বিভিন্ন গ্রামের ভেতরে এসে কৃষকের কাছ থেকে সবজি নিচ্ছেন। এতে তাদেরও সুবিধা, সতেজ সবজি কম খরচে পাওয়া যায়। কিন্তু বাজার ইজারাদাররা সন্তুষ্ট নয়। ক্ষেত থেকে সবজি না কেনার জন্য হুমকিও দিয়েছেন। এখন এসব  এলাকা থেকে সবজি নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাবনার উপপরিচালক কৃষিবিদ আজাহার আলী জানান, সরকারের কৃষি বান্ধব নীতিমালা অনুযায়ী প্রান্তিক চাষীরা যেখানে খুশি সেখানে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। তাদের বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। দাপুনিয়া ইউনিয়নসহ সকল কৃষি নির্ভর এলাকার বাজার ইজারাদারদের এ ব্যপারে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এরপরেও যদি কেউ কৃষিপণ্য বিক্রিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলতি মৌসুমে জেলায়  তিন হাজার ৯৭৬ একর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়েছে।

ইত্তেফাক/এসি