অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় পেঁয়াজ রপ্তানি আপাতত বন্ধ রেখেছে ভারত। ফলে গতকাল সোমবার হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কোনো পেঁয়াজ ঢোকেনি বাংলাদেশে। এদিকে হঠাত্ করে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখায় দেশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে হিলি স্থল ও শুল্ক স্টেশনের উপ-কমিশনার সাইদুল আলম গতকাল রাতে সাংবাদিকদের বলেন, পেঁয়াজ সংকটের কারণে ভারত রপ্তানি সাময়িক বন্ধ রেখেছে। দিল্লিতে এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
দেশের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখা মূল্যবৃদ্ধির একটি কৌশল। তারা পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়াবে। গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের আগে কয়েক দফায় পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়ায়। এদিকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য যেসব এলসি খোলা রয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর বিপরীতেও কোনো পেঁয়াজ রপ্তানি হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে আমদানিকারকরা।
পেঁয়াজ আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পেঁয়াজ উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে বেঙ্গালুরে পেঁয়াজের উত্পাদন পুরোপুরি মার খেয়েছে। এজন্য তারা চাহিদামতো পেঁয়াজ সরবরাহ করতে পারছে না। তবে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের মতো কোনো অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। এটা মূল্যবৃদ্ধির কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি পেঁয়াজ আমদানির জন্য যেসব এলসি খোলা রয়েছে সেগুলোর বিপরীতেও পেঁয়াজ রপ্তানির দাবি জানান। তিনি বলেন, আমাদের এলসির বিপরীতে অনেক ট্রাক মাল নিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন যদি এই পেঁয়াজ ছাড় না করে তাহলে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ব। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে ভারতের রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে দেশের পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমনিতেই গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ও দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হয়। যা এক সপ্তাহ আগেও যথাক্রমে ২৫ থেকে ৩০ টাকা ও ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ছিল। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখলে এই দর আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পেঁয়াজের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক প্রত্যাহারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) গত সপ্তাহে চিঠি দিয়েছিল। তবে এনবিআর পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের পক্ষে নয় বলে গতকাল সংস্থাটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে নিজেদের ‘অপারগতা’র কথা জানিয়ে দিয়েছে।
গত বাজেটে এনবিআর পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এনবিআরের শুল্ক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এই শুল্ক দাম বাড়ার জন্য বাস্তবে দায়ী নয়। এর আগেও এ বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিলাম। অন্যদিকে ট্যারিফ কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পরনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে স্থানীয় উত্পাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়া দরকার। এজন্য কীভাবে তাদের রক্ষা করা যায়, তা ভাবতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। আর এই চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানি করে মেটানো হয়। কারণ, গত কয়েক বছরে দেশে পেঁয়াজের উত্পাদন বাড়লেও আমদানি বেড়েছে তার চেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পেঁয়াজের উত্পাদন ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টনে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু এই সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে অনেক বেশি।
পেঁয়াজ বিক্রি আরো জোরালো করবে টিসিবি
পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশে খোলাবাজারে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে ৩০ টাকায়। গতকাল টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির ইত্তেফাককে বলেন, টিসিবি এবার যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম চলবে।