আক্রমণ কৌশলে পরিবর্তন পরমাণু ঝুঁকি বাড়ছেই

 ‘এইএনএফ’ বা ‘ইন্ট্যারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ ‘ট্রিটি’টি  দীর্ঘদিন থেকেই ইউরোপের পরমাণু নিবারক হিসেবে কাজ করে আসছিল। সম্প্রতি এই চুক্তির কার্যকারিতা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক পরমাণু নিরাপত্তার স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উল্লেখ্য, মাত্র কিছুদিন আগেই ‘এইএনএফ’ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মস্কো এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের এই  সিদ্ধান্তে কিছুটা বিপাকে পড়েছে রাশিয়ার সামরিক কৌশল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াও। তাই চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটনকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে মস্কো। অন্যথায় রাশিয়া সুনির্দিষ্ট পাল্টা পদক্ষেপ নেবে বলে হুমকি দিয়েছে। এতদসত্ত্বেও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত আছে। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে বেশকিছু পাল্টা পদক্ষেপও নিয়েছে রাশিয়া। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত চলমান স্থিতাবস্থা গুরুতর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৫ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটি জাপানে দুটি পরমাণু আক্রমণ সম্পন্ন করে। তখন ২০ কিলোটন শক্তিসম্পন্ন বোমাদুটির আক্রমণের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ববাসী। আবার এই ঘটনার মাত্র তিন বছর পর তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও পরমাণু অস্ত্র তৈরির সাফল্য দেখায়। সোভিয়েত সাফল্যের মধ্য দিয়ে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য ফিরে আসে। কিন্তু বৃদ্ধি পায় পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা। ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শত্রুপক্ষীয় পরমাণু আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারটি। মূলত জাতীয় নিরাপত্তা সুদৃঢ় রাখার লক্ষ্যে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সর্বাধিক কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ভীতি নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব করে তোলে। যে কারণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় জোর দেওয়া হয় ‘কোনোভাবেই পরমাণু আক্রমণ নয়’ নীতির উপর। এই বাস্তবতায় দীর্ঘ দিন থেকে পরমাণু নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘আগে আক্রমণ নয়’ এই সমঝোতা সবপক্ষের বিবেচনায় অগ্রাধিকার পেয়ে আসছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট অস্থির। স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর নতুন মেরুকরণের ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপর্যুক্ত সমঝোতাটির কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। কিছুদিন আগেই আমেরিকা কর্তৃক ছোট আকারের পরমাণু অস্ত্র তৈরির ব্যাপারটি আলোচনায় আসে। সর্বশেষ দেশটি পরমাণু আক্রমণ সীমিত করতে সক্ষম  ‘এইএনএফ’ চুক্তি বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া নিজের পরমাণু আক্রমণ সংক্রান্ত আইনের পরিবর্তন চাইছে। মাত্র তিন-সপ্তাহ আগে রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ডুমায় এ-সংক্রান্ত এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত আলোচনা শেষে রুশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান  এই আলোচনাকে ফলপ্রসূ করার ইঙ্গিত দেন। এমনটি হলে সুনির্দিষ্টভাবে পরমাণু নিরাপত্তার ব্যাপারটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে সবাইকে। তাই এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে প্রাসঙ্গিক দুটি বিষয়। এক, এই দুটি দেশ কিংবা তাদেরকে ঘিরে অথবা অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর পরমাণু আক্রমণ সংক্রান্ত নীতির সাধারণ ভিত্তি কী হবে। দুই, পরমাণু আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা-সংক্রান্ত উন্নত কৌশল রপ্ত করতে পরাশক্তিগুলোর ব্যয়বহুল কর্মকৌশল।

আগে জানা দরকার রুশ-মার্কিন পরমাণু আক্রমণ কৌশল সংক্রান্ত চলমান বাস্তবতা কী রকম? ‘লঞ্চ অফ ওয়ার্নিং’ (launch On Warning) হচ্ছে একটি নিবারক ব্যবস্থা। এর আওতায় মস্কো ও ওয়াশিংটন পরমাণু আক্রমণ-সংক্রান্ত সদা সতর্কতা অবলম্বন করে আসছে। ব্যাপারটি কিছুটা এরকম যে— এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মস্কো কিংবা ওয়াশিংটন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরস্পরের পরমাণু আক্রমণের আগাম তথ্য পাবে। যে প্রক্রিয়ায় আক্রমণকারী দেশটিও দ্রুত নিশ্চিত পাল্টা আক্রমণের শিকার হবে। এক্ষেত্রে উভয় দেশের সেনা কর্তৃপক্ষ সুপ্রীম কমান্ডের নির্দেশ পেয়ে পাল্টা আক্রমণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় নেবে মাত্র ১২ থেকে ১৫ মিনিট। ভূমি কিংবা আকাশ অথবা সমুদ্র থেকে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা অন্যান্য কৌশলগত অস্ত্রের সাহায্যে এরকম আক্রমণ সম্ভব। বলা চলে নিশ্চিত পাল্টা আক্রমণের এই ঝুঁকিটি এড়িয়ে চলতেই উভয় দেশ প্রথম আক্রমণ থেকে নিজদের সংযত রাখবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা বর্তমানে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় আছে।

ধারণা করা হচ্ছে, উভয় দেশ শত্রুপক্ষীয় কৌশল ফাঁকি দিয়ে ভিন্ন উপায়ের আক্রমণ কৌশল রপ্ত করতে মরিয়া। যে প্রক্রিয়ায় আক্রমণকারী দেশ নিজেকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। জানা যায়, নিজের জনগণকে শত্রুপক্ষীয় পরমাণু আক্রমণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মস্কো ও ওয়াশিংটন। কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় যে মস্কোর প্রায় আড়াই কোটি লোককে দ্রুত সময়ের মধ্যে পাতালে দীর্ঘমেয়াদী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে অনেকটাই এগিয়ে গেছে রাশিয়া। অন্যদিকে আমেরিকা পরমাণু আক্রমণকে আকাশেই ঠেকিয়ে দিতে সচেষ্ট। এক্ষেত্রে আমেরিকার অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ‘নাইক জিউস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুই পরাশক্তির এই সকল তত্পরতার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যই হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণেই এরকম মারাত্মক ধ্বংসসাধনকারী অস্ত্র আক্রমণের কথা বিবেচনায় রাখছে তারা। যে কারণে পরমাণু আক্রমণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করার ব্যাপারটি ক্রমেই আলগা হয়ে যাচ্ছে। যাতে বাড়ছে ভয়। কখন না উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে হঠাত্ আক্রমণ থামিয়ে দেয় সভ্যতার অগ্রযাত্রা।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, ম্যানহাটন প্রকল্প থেকে অদ্যাবধি পরমাণু খাতে আমেরিকার সামগ্রিক ব্যয় প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫৭ ভাগ ব্যয়ই হচ্ছে উন্নত পরমাণু আক্রমণ কৌশল রপ্তের উদ্দেশ্য। অর্থাত্ কীভাবে আক্রমণ নিখুঁত করা যায়। অন্যদিকে মাত্র ৭ ভাগ অর্থ ব্যয় হয় সরাসরি পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে। মূলত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিনভিত্তিক আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, স্বাধীনভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম পুনঃপ্রবেশ যান, এন্টিব্যালাস্টিক মিসাইল ইত্যাদি বিভিন্ন দ্রুত গতিসম্পন্ন পরমাণু অস্ত্র বহন উপযোগী যুদ্ধযান তৈরি করা হচ্ছে। উভয় দেশের কাছেই এধরনের বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্রের ছড়াছড়ি। উল্লেখ্য, বিশ্বের ৯টি স্বীকৃত দেশের হাতে থাকা মোট ১৫ হাজার পরমাণু অস্ত্রের মধ্যে ৯০ ভাগই আছে আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছে। এছাড়াও উভয় দেশের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু সংস্করণ ও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে। আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কম গতিসম্পন্ন এইসব ক্ষেপণাস্ত্রের উত্পাদন সীমিত করতে সহায়তা করেছিল ‘এইএনএফ’ সল্ট, স্ট্যার্ট, এবিএম চুক্তিগুলো। যে কারণে এইএনএফ চুক্তি-উত্তর দুনিয়ার পরমাণু ঝুঁকি বৃদ্ধির ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক এজেন্ডা। আর বর্তমানে উভয় দেশ পূর্বতন বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা করছে সেটি অবশ্যই বিবেচনায় রাখা উচিত্। এই উত্কণ্ঠা এই উদ্বেগ কীভাবে কমবে আমরা জানি না। এখানে সাবেক একজন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কথা প্রাসঙ্গিক। অনেক আগেই পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে এন্থনী লেক বলেছিলেন, ‘আগে প্রশ্নটি ছিল শান্তির, বর্তমানে সেটি মানব জাতির অস্তিত্ব তথা বাঁচামরার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে’।                        

n লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক