শেয়ারবাজারে বাইব্যাক প্রসঙ্গ

আমাদের দেশের শেয়ারবাজার বেশ কয়েক বছর যাবত্ ধুঁকছিল। বিভিন্ন অনিয়ম-অসংগতি, নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, সর্বোপরি সরকারের স্থির সিদ্ধান্তের অভাব আর দোদুল্যমানতায় মানুষের আস্থা একেবারে তলানিতে পৌঁছায়। পরিণতিতে ভালোমন্দ নির্বিশেষে প্রায় প্রতিটি শেয়ারের মূল্য তলানিতে এসে ঠেকে। এর মধ্যে করোনা এসে পড়ায় শেয়ারমূল্যে অতিমাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর কারণে প্রতিটি শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যপতন ঘটতে থাকে। এরূপ অবস্থায় শেয়ারের আরো মূল্যপতন ঠেকাতে বিএসইসি ফ্লোর প্রাইস নির্ধারিত করে দিলে মূল্যপতন রোধ হয়। এরপরেই শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।

জুন মাসে বাজারের কার্যক্রম চালু হলে অনেক দিন শেয়ারের কোনো ক্রেতা মেলেনি। এরপর স্বল্পমাত্রায় লেনদেন চালু হলে বিনিয়োগকারীরা এক দিকে যেমন ভীত হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে, অপর দিকে এরূপ সর্বনিম্ন মূল্যে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার ফোর্সড সেল করে দিলে অনেক বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়।

নতুন করে বাজার চালু হলে সংগত কারণেই বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের কাছে বিনিয়োগকারীরা অনেক প্রত্যাশা করতে থাকে। নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কমিশন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে বাজার উন্নয়নে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেয়। গভর্নর আশ্বস্ত করে বলেন, করোনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যেরূপ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে শেয়ারবাজারেও তা প্রযোজ্য হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেয়ারবাজার তা থেকে বঞ্চিত হয়।

শেয়ারবাজারের অব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে, যখন থেকে পূর্বতন বিএসইসি বাছবিচার ছাড়াই একে একে দুর্বল আর মন্দ কোম্পানিগুলোকে আইপিওর মাধ্যমে টাকা উঠানোর ব্যবস্থা করে দেয়। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া কিছুকাল পরেই বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারমূল্যে অস্বাভাবিক পতন ঘটতে থাকে। এর মধ্যে যেমন ফেসভ্যালুর শেয়ার আছে, তেমনি রয়েছে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসা উচ্চমূল্যের আইপিওতে আসা শেয়ার। এরূপ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা দাবি তুলতে থাকে, আইপিওতে আসা শেয়ারের বাজারমূল্য যদি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় তবে, ইস্যুয়ার কোম্পানিকে সেই শেয়ারগুলো ইস্যুমূল্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কিনে নিতে, তথা বাইব্যাক করতে হবে। প্রয়োজনে এর জন্য বিদ্যমান আইন সংশোধন করতে হবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাইব্যাক আইনের বিষয়টি কার্যকর করার দাবিটি দীর্ঘদিনের। বিনিয়োগকারীদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি সম্প্রতি কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন এই নিয়ে নিশ্চয় কদিন খুব আলোচনা হবে। বাজারও উত্তপ্ত থাকবে। তবে ধারণা করা যায়, এই আইনটি অনুমোদনকালে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

১) শেয়ারবাজারে আইপিও আসবেই। নতুন শিল্প স্থাপন ছাড়াও, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য আইপিওর অনুমোদন দিতে হবে। পৃথিবীব্যাপী সেটাই চলে আসছে।

২) যেসব কোম্পানি কমপক্ষে পরপর তিন বছর ভালো লাভ করেছে তাদেরকেই সাধারণত আইপিও ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে রেপুটেড কোনো গ্রুপ যদি একদম নতুন কোম্পানি সৃষ্টির জন্য আইপিও ছাড়তে চায়, তাহলেও অনুমোদন দেওয়া হয়। অনেক দেশেই এরূপ ব্যবস্থা আছে।

৩) ফেসভ্যালুতে আইপিও ছাড়তে চাইলে সাধারণত বিএসইসি ততটা বাছবিচার করে না। অডিট প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিএসইসি অনুমোদন দিয়ে দেয়। তবে সেক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। দেখা গেছে, অনেক মন্দ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও অডিট কোম্পানি ভালো দেখিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট তৈরি করে দিয়েছে। সেগুলোকে বিএসইসি বাজার থেকে আইপিও ছেড়ে অর্থ উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে। উত্তোলিত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় যথারীতি সেগুলোর বাজারমূল্য অস্বাভাবিক কমে গেছে।

৪) তবে মূল সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেসব কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে উচ্চমূল্যে আইপিও ছেড়ে টাকা তুলেছে সেগুলোর ক্ষেত্রে। কথিত নামিদামি অনেক কোম্পানিও এমন কাজ করেছে। এসব শেয়ারে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কেন এমন হয়...? এই পদ্ধতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান আর মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বিডিংয়ে ডাকা হয়। তাদের বিডিংয়ের পর বিএসইসি কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ করে, আইপিওর মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। এই বিডিংটাই যত গোলমালের উত্স। এখানে কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক আর বিএসইসির কিছু ব্যক্তির একটি যোগসূত্র থাকে। যদিও বলা হয়, পরবর্তী বেশ কিছু কাল প্লেসমেন্ট আর পাবলিক অফার ব্যতিরেকে বিক্রিত শেয়ার সেল করতে পারবে না, তবুও তাদের সমস্যা হয় না। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অঢেল অর্থ রয়েছে। তারা আর তাদের সহযোগীরা মিলে ঐ বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত শেয়ারটির বাজারমূল্য কৃত্রিমভাবে ধরে রাখে। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেই মূল্যপতন ঘটতে শুরু করে। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর দাম প্রাথমিক আইপিও মূল্যের এক চতুর্থাংশ বা এক পঞ্চমাংশে নেমে আসে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়। এর ব্যতিক্রমও আছে। তবে তার সংখ্যা নগণ্য।

৫) এখন তা হলে করণীয় কি? বিএসইসির এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু তার জন্য একটা সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কেবল ইস্যুয়ার কোম্পানিই নয়, ইস্যু ম্যানেজারদেরকেও বাইন্ডিংসয়ে নিয়ে আসতে হবে। এর বাইরেও যেসব প্রতিষ্ঠান বিডিংয়ে অংশ নেবে, তাদের প্রদত্ত মূল্য আর প্রস্তাবিত সংখ্যাটিও স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। যাতে তাদেরকেও প্রদত্ত মূল্যে বাইব্যাকে বাধ্য করা যায়। এতে কাজ হবে। সমঝোতা করে নাটকীয় দাম অফার করার আগে ১০ বার ভাববে। তবে আগেই বলেছি, এই প্রস্তাবটি মাত্র অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর সংসদে পাশ করানো লাগবে। আর পাশ হলে তারপর আইনে পরিণত হবে। তারপর কার্যকর হবে। এখনি নয়। আর কোনো আইন ভূতাপেক্ষ কার্যকর হয় না। আগের কোনো কোম্পানির শেয়ার এই আইনবলে বাইব্যাক করানো যাবে না। বিএসইসির দুই সিসি ধারায় অবশ্য এখনই এটা কার্যকর করা যায়। তবে মনে হয় সেটা সংগত হবে না।