হত্যার পর খুনির ফোন ৯৯৯ নম্বরে, শেষ অব্দি পুলিশে নজর এড়াতে ব্যর্থ

একটি অটোরিকশা ছিনতাই করতে সীমাহীন নৃশংসতার পর উপস্থিত চতুরতাকে কাজে লাগিয়েও লাভ হলো না ঘাতক রাব্বীর। অটোরিকশা ছিনতাই করতে কৌশলে ভাড়া নিয়ে সারাদিন ঘুরে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে নৃশংসতাও। চালককে জুসে চেতনানাশক মিশিয়ে খাইয়ে দেওয়া, অতপর চালক বুঝতে পেরে ধস্তাধস্তি। এরপরই চালককে ছুরি আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। লাশ গুম করতে ফেলা দেওয়া হয় ধানক্ষেতে। ছিনিয়ে নেওয়া হয় অটোরিকশাটি। এরপর দুইদিন নিখোঁজ থাকেন ওই রিকশার চালক মো. মিনহাজ উদ্দিন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।

অবশেষে পুলিশের নজর এড়াতে ব্যর্থ হয়ে নিজের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নিখোঁজ মিনহাজের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের জোরগাছায় ধানক্ষেত লাশটি উদ্ধার করা হয়। এসময় উদ্ধার করা হয়েছে ছিনিয়ে নেওয়া অটোরিকসাটিও।  

লাশ উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেন জেলার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূঞা। এসময় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গাজিউর রহমান, শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এসএম আবুল কালাম আজাদসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। 

নিহত ওই অটোরিকসা চালক মিনহাজ জেলার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের বিশ^হরিগাছা গ্রামের মো. মোজদার আলীর ছেলে। ঘাতক রাব্বী হাসান একই উপজেলা ও ইউনিয়নের বোহালগাছা গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালের দিকে অটোরিকসা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তিনি। এদিকে অটোরিকসা চালক মিনহাজকে হত্যার পর তার লাশ গুম করে ছিনতাইয়ের নাটক মঞ্চস্থ করেন ঘাতক মো. রাব্বী হাসান (২৫)। এমনকি নিজেই ৯৯৯-ফোন করে তারা ছিনতাইয়ের কবলে পরে আহত হয়েছেন বলে দাবি করে ঘটনা জানায়। একই সঙ্গে চিকিৎসার জন্য শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি হন। পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করতে যান তিনি। কিন্তু তার বক্তব্য ও কর্মকা- সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাকে আটক করা হয়। 

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গাজিউর রহমান জানান, অটোরিকসাটি ছিনিয়ে নিতেই মিনহাজকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাই আগে থেকেই ক্রেতাও ঠিক করে রেখেছিল ঘাতক রাব্বী। আর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর সকালের দিকে ভাড়ার কথা বলে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ওই অটোরিকসা নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করেন তারা। একপর্যায়ে রাত নেমে এলে জুসের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে চালককে খাওয়ানো হয়। তবে বিষয়টি বুঝতে পেরে চালক মিনহাজ ঘাতক রাব্বীর হাতে কামড় দেন। এনিয়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি তার লাশ গুম করতে ওই ফাঁকা মাঠের ধানক্ষেতের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। আর অটোরিকসাটি নিয়ে চলে যায় ঘাতক রাব্বী।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৬ বছরের কিশোরকে সংঘবদ্ধ বলাৎকারের পর মামলা তুলে নিতে যুবলীগ নেতার হুমকি 

কিন্তু অটোরিকসাটি চোরাই ভেবে কিনতে অস্বীকৃতি জানান শেরপুর শেরুয়া বটতলা বাজার এলাকার সুমন নামের ওই ক্রেতা। এতে বিপাকে পড়ে যান ঘাতক রাব্বী। শেষমেষ উপায়অন্ত না পেয়ে অটোরিকসাটি ফেলে রেখে নিজেই আইনের আশ্রয় নিতে থানায় যান। 

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘাতক রাব্বী পুলিশকে জানায়, অটোরিকশা যোগে ঘটনার রাতে তারা দু’জন বাড়ি যাচ্ছিল। পথিমধ্যে শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর করতোয়া ব্রিজের কাছে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। ছুরিকাঘাত করে তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নেয় তারা। তবে কৌশল অবলম্বন করায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় কোন রকমে রক্ষা পেয়েই ৯৯৯-এ ফোন করেন। তাদের পরামর্শে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর থানায় যান। কিন্তু তার এসব কথাবার্তায় নানা গড়মিল লক্ষ্য করা যায়। তাই সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে সব খুলে বলেন। অটোচালক মিনহাজকে নিজেই ছুরিকাঘাতে হত্যার করেছে বলে স্বীকার করেন। পরে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সুঘাট ইউনিয়নের আওলাকান্দি এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিনতাই হয়ে যাওয়া অটোরিকসাটি উদ্ধার করা হয়। সেইসঙ্গে তার দেয়া তথ্যনুযায়ী ওই ধানক্ষেত থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে এই হত্যাকা-টি সর্ম্পকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এজন্য আদালতে রিমা- চাওয়া হবে।  

এদিকে নিহতের লাশের ময়না তদন্তের জন্য বহস্পতিবার বিকেলেই বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলার প্রক্রিয়া চলছিল বলে জানা গেছে।

ইত্তেফাক/এসি