নূতন বত্সরে দেশের সকল ব্যাংকে সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ হার কার্যকর করিবার দাবি আবার উঠিতে শুরু করিয়াছে। ইহা খুবই দুঃখজনক যে, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি’র (ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নেতাদের যৌথ ঘোষণা এবং এই সংক্রান্ত পাঁচটি সুযোগ-সুবিধা সরকারের নিকট হইতে গ্রহণ করিবার পরও সিঙ্গেল ডিজিটে সুদহার আজও বাস্তবায়ন করা হয় নাই। সমপ্রতি রাজধানীতে চারদিনব্যাপী টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস মেশিনারির প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি এই বিষয়টি নূতন করিয়া আলোচনার টেবিলে আনিয়াছেন। ইহার আগে ইত্তেফাক সিঙ্গেল ডিজিটে সুদহার বাস্তবায়নের বাস্তব ও সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়া একটি গঠনমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাহাতে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ২৮টি ব্যাংক নির্ধারিত সুদহার না মানিয়াই ঋণ বিতরণ করিতেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্প ঋণে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেওয়া হইতেছে।
নূতন অর্থমন্ত্রী প্রথম হইতেই খেলাপি ঋণ আদায়ের উপর গুরুত্বারোপ করিতেছেন। সমপ্রতি ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলিয়াছেন যে, আজ হইতে আর এক টাকারও খেলাপি ঋণ বাড়িবে না। খেলাপি বা ননপারফরমিং লোন কমিলে ব্যাংক সুদের হারও কমিয়া যাইবে। আবার এই কথাও সত্য, বর্তমানে যে এক লক্ষাধিক কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রহিয়াছে, তাহা তৈরিতে ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার পালন করিয়াছে অনুঘটকের ভূমিকা। বিশ্বের কোথাও এমন উচ্চ হারে সুদ গ্রহণ করিবার নজির নাই। বিশেষত বর্তমানে ছোট শিল্পের জন্য অনেক বেশি সুদ নেওয়া হইতেছে যাহা আত্মঘাতী বলা যাইতে পারে। ইহাতে তাহাদের ব্যবসা পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হইয়া পড়িতেছে। অথচ এসএমই হইতেছে শ্রমঘন একটি খাত। সবদিক চিন্তা করিয়া এবং দেশের কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাইয়া আনিবার নির্দেশ দেন। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সম্মতির ভিত্তিতে তাহা গত বত্সরের পহেলা জুলাই হইতে কার্যকর করিবার কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক তাহা না করিলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাহারা জরুরি বৈঠক করিয়া গত বত্সরের ৯ আগস্ট হইতে তাহা কার্যকর করিবার কথা বলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য হইতে প্রমাণিত হয়, তাহারা আসলে এই ব্যাপারে কোনো নির্দেশনারই তোয়াক্কা করিতেছেন না।
ইহার আগে ব্যাংক মালিকগণ বলিয়াছিলেন যে, ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়া ৯ শতাংশে সুদে ঋণ দেওয়া কষ্টকর। ইহা পুরাপুরি বাস্তবায়নে কিছু সময় লাগিবে। কিন্তু তাহাদের ঘোষণার পর ছয় মাস অতিবাহিত হইয়া গেলেও তাহা বাস্তবায়ন না করায় প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নহে। বস্তুত বিনিয়োগ ও উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখিতে হইলে সুদ হার কমানোর কোনো বিকল্প নাই। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়কে নূতন করিয়া জোরালো পদক্ষেপ নিতে হইবে। এই ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে টিম রহিয়াছে, তাহাদের আরও সক্রিয় হইতে হইবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলির পরিচালনা পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করিয়া এইখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।