এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ইস্যুতে বক্তারা
ইত্তেফাক রিপোর্ট
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্বাভাবিক নিয়মেই উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। এটি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করার চিন্তা করছে না বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আগামী চার বছর পর থেকে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথা রপ্তানি বাণিজ্যে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে ব্যবসায়ের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, বিভিন্ন ঘাটে ব্যবসায়ের ব্যয় কমানো তথা নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে সুবিধায় রূপান্তর করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ পিছিয়ে যেতে পারে।
গতকাল শনিবার ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) আয়োজিত এক অনলাইন সেমিনারে (ওয়েবিনার) তারা এসব কথা বলেন। ‘২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ এবং বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক ঐ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। আইবিএফবির সভাপতি হুমায়ূন রশিদের সঞ্চালনায় এতে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও অর্থনীতিবিদরা রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের মতামত তুলে ধরেন। এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা ব্যবসায়ের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা, বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামে দরকষাকষিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্য ও সেবার মূল্য সংযোজন আরো বাড়ানো তথা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। কেবল শুল্ক কমে যাবে—এমন চিন্তা করে এফটিএ থেকে দূরে থাকার কারণে একসময় বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিয়েতনামের এফটিএর উদাহরণ টেনে বলেন, এতে ইউরোপে পণ্য রপ্তানিতে ভিয়েতনাম প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ পোশাক পণ্য ক্রয়ে ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় করতে হবে। অর্থাত্ প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে যাব। আমাদের ব্যবসায়ের ব্যয় কমানো দরকার। এছাড়া দেশভিত্তিক এফটিএ করতে হবে। কিন্তু এখানে নজর কেবল রাজস্ব বাড়ানোর দিকে।
হুমায়ূন রশিদ বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ব্যবসায়ের খরচ কমানো এবং দ্বিপাক্ষিক এফটিএতে নজর দিতে হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবসায়ের খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এটাই হবে ‘গেম চেঞ্জার’। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক এফটিএতে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অনেক সুযোগও তৈরি হবে।
এ সময় বক্তারা বলেন, এফটিএ হলে আমরা যেমন রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাব, তেমনি আমদানিতেও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। শুল্ক কমে যাওয়ার ভয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিঅর) থেকে এ বিষয়ে বরাবরই বাধা আসে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে শুল্ক আদায় কমলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়বে।
ব্যবসা সহজ করা ও ব্যবসায়ের খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সালমান এফ রহমান। এ লক্ষ্যে অনেক কাজ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মধ্যে যদি সুন্দর অনুকূল ব্যবসায়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারি—সেক্ষেত্রে এলডিসি থেকে উত্তরণ চ্যালেঞ্জ নয়, সুবিধা তৈরি করবে। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়েই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে এবং এটি আমাদের জন্য গর্বের। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা দরকার বলে মত দেন তিনি।
এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিওটিও সেলের মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান, আইবিএফবির সহসভাপতি এম এস সিদ্দিকী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মঞ্জুর হোসেন প্রমুখ।