এখনও মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর রেমিট্যান্স

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম রেমিট্যান্স। তবে বরাবরের মতো এখনো দেশের রেমিট্যান্স মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এরসঙ্গে আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া। সরকার বিভিন্নভাবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করলেও এ অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশে ৭৪৯ কোটি ১২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে। এ অর্থের অর্ধেকই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের অল্প কয়েকটি দেশ থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের রেমিট্যান্স অল্প কয়েকটি দেশনির্ভর। দেশে গত ছয় মাসে আসা রেমিট্যান্সের ৮১ দশমিক ৪২ শতাংশ এসেছে আটটি দেশ থেকে। এ আট দেশের মধ্যে পাঁচটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যের। মধ্যপ্রাচ্যের দেশের মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ভালো রেমিট্যান্স আসা দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদায়ী বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ১২৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। আগের মাস নভেম্বরে ১১৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। যেখানে গত বছরের ডিসেম্বরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি ডলার। অর্থাত্ শুধু বছর হিসাবেই নয় একক মাসের হিসাবেও রেমিট্যান্স বেড়েছে।

আর্থিকখাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরের শুরু থেকে পণ্য আমদানি বাড়ার কারণে বাজারে এখন ডলারের চাহিদা বেশি। সে কারণে ব্যাংকগুলো তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই রেমিট্যান্স আনতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে, বর্তমানে বেশি টাকা পাওয়ার কারণে প্রবাসীরাও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এছাড়া অবৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশকিছু উদ্যোগও কাজ করেছে।

২০১৫ সালের পর থেকে প্রত্যেক মাসেই ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছিল। রেমিট্যান্স বাড়াতে নেওয়া উদ্যোগগুলোও কাজ করছিল না। ফলে সংশ্লিষ্টরা খুবই উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। তবে গত অর্থবছরে সে অবস্থা থেকে উত্তরণ হওয়ায় স্বস্তি মিলেছে। ২০১৬ সালে এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল। ২০১৫ সালে এসেছিল এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। আর ২০১৪ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৯২ কোটি ডলার।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে যখন রেমিট্যান্সের পরিমাণ একেবারেই কমে গিয়েছিল তখন রেমিট্যান্স কম আসার কারণ অনুসন্ধান ও হুন্ডির বিষয়ে নিশ্চিত হতে সরেজমিনে তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই তদন্তে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়টি ধরা পড়ে। হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার গ্রাহক ও এজেন্টের একাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর প্রতিমাসেই আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। একক মাস হিসাবে যা ছিল ৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বরাবরের মতো সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এদেশ থেকে এসেছে ১৪২ কোটি ২২ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ১১৫ কোটি ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৬ কোটি ৩২ লাখ ডলার। এরপর কুয়েত থেকে এসেছে ৬৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং যুক্তরাজ্য থেকে ৫০ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

ওমান থেকে এসেছে ৪৮ কোটি ১২ লাখ ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। কাতার থেকে এসেছে ৪৮ কোটি সাত লাখ ডলার। এর বাইরে ইতালি থেকে ৩৭ কোটি ৪১ লাখ ডলার এবং বাহরাইন থেকে এসেছে ২৩ কোটি ৫২ লাখ ডলার।

কাঙ্খিতহারে রেমিট্যান্স না বাড়লেও রেমিট্যান্স আয়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে- দিন দিন জনশক্তি রপ্তানি কমে যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যত জনশক্তি রপ্তানি হয় তার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে তিন লাখ ৯২ হাজার ২৫০ জন। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। গত বছরের পরের ছয় মাসে জনশক্তি রপ্তানি আরো কমেছে। বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সৌদি আরব সেদেশে ১২ ধরনের কাজে বিদেশিদের নিষিদ্ধ করেছে। এতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে আগের মতো কম দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিও কমেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশিদের রপ্তানি প্রায় একই রকম আছে।