গণতন্ত্রের স্বার্থে সংসদে এসে কথা বলুন

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের স্বার্থে সংসদে এসে জনগণের কথা বলতে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিজেদের দোষেই তারা সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরেছে। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের যদি নেতৃত্ব না থাকে, মাথাই না থাকে, তাহলে সেই রাজনৈতিক দল কীভাবে নির্বাচনে জেতার কথা চিন্তা করতে পারে? তারপরও যে কয়টা সিটে তারা জিতেছে, গণতন্ত্রের স্বার্থে তাদের পার্লামেন্টে আসা প্রয়োজন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথসভায় সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করেছি বলেই আমরা ক্ষমতায় এসেছি। আমরা কিন্তু কোনো প্রতিশোধ নিতে চাইনি বা আমরা কাউকে কোনো হয়রানিও করতে যাইনি। দেশের মানুষ সবাই দেখেছে কোনোমতে নির্বাচনটা যেন বানচাল করা যায় সেই চেষ্টাই বিএনপি করেছে। কিন্তু তা তারা পারেনি। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত ‘মুজিব বর্ষ’ পালিত হবে। সারাদেশব্যাপী ও আন্তর্জাতিকভাবে করব। এক বছর ধরে চলবে উত্সব। একইসঙ্গে পালিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমাদের সৌভাগ্য স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। সুবর্ণজয়ন্তীও আমরা পালন করব। জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন, যারা স্বাধীনতা এনেছে সেই সংগঠনকেই ভোট দিয়ে দেশসেবার সুযোগ দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, একটি রাজনৈতিক দলে পলাতক আসামি দিয়ে রাজনীতি করতে গেলে কী রেজাল্ট (ফলাফল) হয় সেটাই তারা পেয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য যদি না হতো তাহলে হয়তো তারা (বিএনপি) আরো ভালো রেজাল্ট করতে পারত।

মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে বিএনপিতে নিজেদের মধ্যে কোন্দল-মারামারির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ জানতে পেরেছে যে এদের চরিত্রটা কী। বিএনপির চরিত্র শোধরায়নি। তাই বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০০৮ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের তুলনামূলক ফলাফল বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৮ সালের চেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অনেক বেশি ভোট পড়েছিল। আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে আমাদের যেটা লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাধীনতার সুফলটা পৌঁছাতে পারা। সেভাবে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছি বলেই মানুষের এই উপলব্ধিটা এসে গেছে, সরকার মানে জনগণের সেবক। আওয়ামী লীগ সরকার থাকলে তারা ভালো থাকে, তাদের জীবনমান উন্নত হয়।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে পেরেছি, তার ফলেই ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেছি। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে যারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল যে কী করবে, তারা কিন্তু সবাই এগিয়ে এসেছিল এই নির্বাচনে আমাদের সমর্থন দেওয়ার জন্য। এখানে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি, মেহনতি মানুষ থেকে ব্যবসায়ী সমপ্রদায় প্রত্যেকের মনে একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আওয়ামী লীগ আসলে তারা ভালো থাকবে, আওয়ামী লীগ আসলে দেশটা ভালো চলবে। আওয়ামী লীগ আসলে দেশের উন্নতি হবে। এই উপলব্ধিটা তাদের মাঝে ব্যাপকভাবে দানা বেঁধে ছিল। বিএনপি নেতাদের অর্থপাচার, ঘুষ-দুর্নীতি, এতিমের টাকা আত্মসাত্, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে নেমেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগই দীর্ঘসময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। জনগণ সেই আস্থা, বিশ্বাস আমাদের ওপর রেখেছে। কাজেই জনগণের প্রতি আমাদেরও কর্তব্য অনেক বেড়ে গেছে। আমাদেরকে এখন একটাই চিন্তা করতে হবে যে, আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি সেগুলো যেমন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আরো কী কী করতে পারি সেটাও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকের শুরুতেই প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা ও তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোক প্রকাশ করা হয়। শেষে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। বৈঠকে অধিকাংশ নেতাই উপস্থিত ছিলেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এটাই ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম নীতি নির্ধারণী বৈঠক।

দল-সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সবাইকে কাজ করার নির্দেশ

সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দল ও সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন। মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে যথাযথ মূল্যায়ন করারও প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘কে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেতা হইলেন, কে সংসদ সদস্য হইলেন, কে মন্ত্রী হইলেন আর কে হলেন না; এটা ভুলে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। জনগণ আমাদের ওপর আস্থা-বিশ্বাস রেখে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমাদেরও চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।’

মনোনয়নবঞ্চিতদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হবে

শেখ হাসিনা বলেন, ‘হতাশার কোনো কারণ নেই। সবাইকে তো আর মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয় না। তারপরও যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন, তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হবে।’

উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত প্রাধান্য দেবে কেন্দ্র

সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয়, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত প্রাধান্য দেবে কেন্দ্র। প্রথমে তৃণমূলের নেতারা প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

১৯ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় মহাসমাবেশ সফল করা, ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ দিবস, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস কর্মসূচিসহ ২০২০ সালের জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে করণীয় ঠিক করতে নির্দেশনা ও পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। জানা গেছে, শিগগিরই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দলের উপ-কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এইচটি ইমাম, ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাকসহ অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।