শিফারুল শেখ
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের আংশিক অচলাবস্থা গতকাল শনিবার ২২তম দিনে পড়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শাটডাউনের ঘটনা ঘটলো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মানের জন্য এই শাটডাউনের প্রয়োজন আছে। শাটডাউনের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডোমোক্র্যাটদের দায়ী করলেও ৬৯ ভাগ মার্কিনী মনে করেন, দেয়াল নির্মাণ দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সিএনএন বলছে, দীর্ঘতম এই শাটডাউনে প্রত্যক্ষভাবে অন্তত ৭৭টি দিক থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে শাটডাউন শুরু হয়।
বড় ক্ষতির মুখে সরকার ও জনগন
কৃষি, বাণিজ্য, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, আবাসন ও নগর উন্নয়ন, অর্থমন্ত্রণালয় এবং পরিবহন বিভাগের ৮ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা বেতনে চাকরি করতে হচ্ছে। বেতন ভাতা না পেয়ে তাদের বাধ্য হয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বেতন না দিয়ে চাকরি করতে বাধ্য করার ঘটনাকে ‘অমানবিক’ উল্লেখ করে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে আমেরিকান ফেডারেশন অব গভর্ণমেন্ট এম্প্লয়িজ। অভ্যন্তরীণ আয়কর বিভাগ তাদের অনেক কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অর্থনীতিবিদদের আশংকা জানুয়ারিতে ৫ লাখ মার্কিনী কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হবেন। ফলে বেকারত্বের হার ৪ ভাগে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক জরিপ সংস্থা জেপি মরগান জানিয়েছে, অর্থ বছরের প্রথম ভাগে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২৫ ভাগ থেকে কমে ২ ভাগে নেমে আসতে পারে। কর্মচারীর অভাবে মিয়ামি বিমানবন্দর কয়েকদিন বন্ধ থাকবে। বেতন ভাতা না থাকায় যাত্রী সংকটে পড়ছে ট্যাক্সি চালকরা। আর্থিক সহায়তার অভাবে পরিবহন খাতের অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসাসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ নতুন করে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, অর্থ না থাকায় তারা নতুন করে নিয়োগ দিতে পারছে না। মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ বিভাগের অনেক কাজ পড়ে আছে শাটডাউনে কারণে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংস্থাটি বিভিন্ন খাদ্য, মাংস ও শাক-সবজির গুনগত মান পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে।
দীর্ঘ শাটডাউন
শাটডাউন বলতে মার্কিন সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হওয়াকে মনে করা হয়। বিনা বেতনে চাকুরিজীবীদের কাজ করতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ বন্ধ হলেও সরকারি-বেসরকারি আরো অনেক প্রতিষ্ঠানে শাট ডাউনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মার্কিন ইতিহাসে শাট ডাউন বা সরকারের আংশিক অচলাবস্থা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট গিরাল্ড ফোর্ডের আমলে দশ দিন শাটডাউন চলে। ১৯৭৭ সালে তিনবার শাট ডাউনের শিকার হয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৮ (১৮ দিন), ১৯৭৯ (১১ দিন), ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৭, ১৯৯০, ১৯৯৫, ২০১৩, ২০১৮ সালে শাট ডাউন হয়। এর আগে সবচেয়ে বড় শাটডাউন ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের (ডেমোক্র্যাট) আমলে ২১ দিন। বর্তমান শাটডাউন চলছে গত ২২ ডিসেম্বর থেকে।
শাট ডাউন কেন
মেক্সিকো সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসবাদী, মাদক পাচারকারীদের রুখতে দেয়াল তৈরি অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে এই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। এমন সাবধানবানী সত্ত্বেও মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দল ট্রাম্পের প্রকল্পের জন্য কিছুতেই ৫৭০ কোটি ডলার মঞ্জুর করতে রাজি হচ্ছে না। গত ২১ ডিসেম্বর একটা বিল পাস করার কথা থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা উল্টো একটা বিল পাস করে। এতে ট্রাম্পের দাবিকৃত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এই সংঘাতের ফলে প্রশাসনিক অচলাবস্থাও জনগণের একটা বড় অংশ ভালো চোখে দেখছে না।
সহজে কাটার সম্ভাবনা কম
শাট ডাউন সহজে কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, মাসের পর মাস এমনকি বছর পর্যন্ত শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মানের হুুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ নিয়ে কাজ চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের এবং সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় খুব সহজে সমঝোতা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, দেয়াল নির্মানের সঙ্গে শাট ডাউনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটি মানছেন না। তিনি গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একটি সমঝোতা বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করেছেন।