জান-ই-আলম
শ্রীনিভাসন- বিশ্ব ক্রিকেটে এক নিন্দিত নাম। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যে নামটার প্রতি ঘৃণার তীব্রতা প্রবল। তিন মোড়ল সৃষ্টি, ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রথা ভেঙে তত্কালীন আইসিসি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালকে (বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী) চ্যাম্পিয়নদের হাতে ট্রফি দিতে না দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের নিন্দা-মন্দের পাত্র হয়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় এই ক্রিকেট প্রশাসক।
গত এক বছর ধরে আরেক ভারতীয় শ্রীনিভাসের দিনমান কাটছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে। ক্রিকেট প্রশাসকের কারণেই হয়তো মুম্বাইয়ের ছেলে শ্রীনিভাস চন্দ্রশেখরনের নামের প্রথম অংশটার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘শ্রীনি’ না হয়ে ‘শ্রী’ বলেই পরিচিতি পেয়েছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বড় ডিগ্রি থাকলেও শ্রী’র জীবন জড়িয়ে গেছে ক্রিকেটের সঙ্গে। ২২ গজে ক্রিকেটারদের লড়াইয়ের কারিকুরি নিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে গবেষণা, বিশ্লেষণের নেশাই বদলে দিয়েছে তার জীবনের চিত্রপট।
কম্পিউটার অ্যানালিস্ট হিসেবে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ জাতীয় দলের যোগ দেন শ্রী। তারপর থেকে দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ বনে গেছেন। বাংলাদেশ দলটা তার কাছে নিজের পরিবারের চেয়ে কম নয়। বিসিবি একাডেমির জিমে একান্ত আলাপে বাংলাদেশ দলের প্রতি শ্রী’র ভালোবাসার টানটা প্রকাশ পেয়েছে। তার বিশ্বাস, কোনো বৈশ্বিক ট্রফি জিততে মাত্র এক বল দূরে আছে বাংলাদেশ!
গত বছর মার্চে নিদাহাস কাপ, সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপের ফাইনালে শেষ বলে হেরেছিল টাইগাররা। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নিয়ে বড় স্বপ্নই দেখেন শ্রী। বলেছেন, ‘আমি জানি না বিশ্বকাপে কত দূর যাবে বাংলাদেশ। আমি এভাবে দেখি যে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ দারুণ সফল হয়েছে। সর্বশেষ চার এশিয়া কাপের তিনটাতেই ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। এরপর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল। সর্বশেষ এশিয়া কাপে আমরা শেষ বলে হেরেছি। আমি শুধু বলবো, কোনো ট্রফি জয় থেকে মাত্র এক বল দূরে আছি আমরা।’
মুম্বাইয়ের স্থানীয় লিগ খেলার সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন শ্রী। সেখানেই এক কোচের পরামর্শে অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু। খেলাটার প্রতি প্রায় দেড় যুগ ধরে বয়ে চলা আবেগ, নেশার প্রতিফলন হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটের খুঁটিনাটি এখন তার ল্যাপটপে জমা।
বলেছেন, ‘আমি সব কিছুর খোঁজ রাখি। মনে করেন, আমি এখন বিপিএলের সাথে আছি, আমি শুধু বিপিএল দেখি না। আমি নিশ্চিত করি, সারা বিশ্বের ক্রিকেটের খোঁজ খবর রাখতে, সব ধরনের তথ্য রাখতে।’
রঞ্জি ট্রফিতে কাজ করার পর ভারতের সব ঘরোয়া টুর্নামেন্টে কাজ করেছেন শ্রী। দুই বছরের পরিশ্রম এবং সফলতা তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তারপর আইপিএলের হায়দরাবাদ, বিপিএলে চিটাগং ভাইকিংস ও রংপুর রাইডার্সে কাজ করেন।
তারপরই টাইগারদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়ে যারপরনাই খুশি, গর্বিত শ্রী। ২৮ বছর বয়সী এই ভারতীয় তরুণ বলেছেন, ‘আমরা অনেকটা পরিবারের মতোন। শুধু ক্রিকেটিং সম্পর্ক নয়, ক্রিকেটের বাইরেও অনেক বিষয়ে আমরা একে অন্যের কাছে শেয়ার করে থাকি। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক খুশি ছিলাম, যখন আমি বাংলাদেশ দলের হয়ে ডাক পেয়েছিলাম। আমি আশা করছি, আমি নিয়মিত বাংলাদেশ দলের হয়ে কাজ করতে পারব।’
বর্তমানে সিরিজ বাই সিরিজ চুক্তিতে কাজ করলেও বিসিবির প্রস্তাব পেলে দীর্ঘমেয়াদে সাকিব-তামিমদের সঙ্গে গাটছড়া বাঁধতে চান শ্রী। বলেছেন, ‘কখনো ছুটি নিয়ে দেশে গেলে এক সপ্তাহ পরেই মনে হয় আমি কিছু একটা মিস করছি। আসলে এখানে ম্যাশ, তামিমের সাথে আমার সম্পর্কটা অন্য রকম। এ ছাড়া জুনিয়রদের সাথেও আমার সম্পর্ক ভালো।’
ক্রিকেট খেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন বহুলপ্রসিদ্ধ। ভারতীয় ক্রিকেটার লোকেশ রাহুল, শেখর ধাওয়ানদের ব্যাটিংয়ে শ্রী’র পরামর্শের প্রভাব অনেক। বন্ধু লোকেশ রাহুল সবসময়ই যোগাযোগ রাখেন তার সাথে।
মাশরাফি বিন মুর্তজাকে বড় ভাই হিসেবেই দেখেন শ্রী। আবার মাশরাফিও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নড়াইল এক্সপ্রেসের ভাষায়, কোনো ক্রিকেটার-কোচের সম্পর্কে তথ্য দিতে শ্রী’র ২-৩ মিনিট সময় লাগে।
শ্রী’র ল্যাপটপে হয় ম্যাচের পরিকল্পনা। আসে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। যেমনটা এশিয়া কাপে তার পরামর্শেই শর্ট মিড উইকেটে দাঁড়িয়ে শোয়েব মালিকের ক্যাচ নিতে পেরেছিলেন মাশরাফি।
শ্রী জানালেন, ‘টিম মিটিংয়ে আমাদের কথা হয়েছিল মালিকের সময় শর্ট মিড উইকেটে ফিল্ডার রাখার জন্য। আমি চিটাগং ভাইকিংসে, এশিয়া কাপের আগে পিএসএলে মুলতান সুলতান দলে ছিলাম আমি। আমি মালিককে খুব কাছ থেকেই দেখেছি, কিভাবে সে ইনিংস বড় করে সেটাও দেখেছি। বাংলাদেশের হয়ে কাজ করার সময় এটা আমাকে সাহায্য করেছে। তখন আমি ম্যাশকে বলেছিলাম, এরপর সে অবিশ্বাস্য ক্যাচটি নিয়েছে।’