নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে অনেক প্রশ্ন

বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল ভারতের লোকসভায় পাস হয়ে গিয়েছে। অবশ্য বিলটিকে আইনে পরিণত করতে হলে রাজ্যসভায় পাস করা করাতে হবে। কিন্তু বিলটি রাজ্যসভায় পাস করানো সম্ভব হয়নি। তবে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি রাজ্যের বৃহত্ অংশের জনগণ এই বিলের বিরোধিতা করে আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। কয়েকদিন ধরেই আসাম থেকে শুরু করে মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, অরুণাচলে মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে দিল্লিকে সতর্ক করছেন। আসামের বিজেপি মন্ত্রিসভার জোটসঙ্গী অনাপ মন্ত্রিসভা থেকে নেতারা পদত্যাগ করেছেন। তারা সরকারের ওপর থেকে সমর্থনও তুলে নিয়েছে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কর্ণাড মাংমা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন আমরা বিজেপি জোটে আর থাকব না।

আর বিজেপি-শাসিত অপররাজ্য ত্রিপুরায় নাগরিকত্ব বিল বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের গুলিতে কিছু মানুষ হতাহত হয়েছেন। বাংলাদেশ লাগোয়া এই ছোট রাজ্যটিতে গত বছর প্রথমবার সিপিএমকে হারিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। সেই ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে অবিলম্বে বাংলাদেশে পাঠানোর দাবি তুলেছে বিক্ষুব্ধরা। তাদের দাবি বিপ্লব ১৯৭২ সালের পরে বাংলাদেশের কুমিল্লায় জন্মেছেন। তিনি কি করে ভারতের নাগরিক হন? তাঁকে অবিলম্বে কুমিল্লায় ফেরত যেতে হবে। বিপ্লবের বাবা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কুমিল্লায় এসে আশ্রয় নেন। সেখানেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। বারো ক্লাসে পড়ার পর তিনি দিল্লি চলে যান এবং আরএসএস-এর প্রচারক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানেই তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান। উত্তরবঙ্গ সীমান্ত রাজ্যগুলোতে আবহমান কাল থেকেই কংগ্রেসের সরকার ছিল, দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর একাধিক রাজ্যে কংগ্রেস থেকে বিধায়কের সঙ্গে জোট বেঁধে বিজেপি সরকার গঠন করেন। নাগরিকত্ব বিল পাস হবার পর সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ এবং সরকারের মন্ত্রী ও বিধায়কদের মধ্যে বিক্ষোভ প্রবল থেকে প্রবলতর হতে দেখেই প্রধানমন্ত্রী মোদী এক বিবৃতি প্রকাশ করে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছেন। ঐ ৭টি রাজ্যের নাগরিকদের আবেদন জানিয়ে বলেছেন—আপনাদের প্রতি অবিচার করা হবে না, আপনারা শান্ত থাকুন। কে কার কথা শোনে, সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর মন্তব্য যেন আগুনে ঘৃতাহুতি দিল, রাজনাথ সিং বলেছেন—বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পার্শী—তাদের কোনো অসুবিধা হবে না, শুধু সংখ্যালঘু মুসলমানদের দেশ থেকে সরে যেতে হবে।

নাগরিকত্ব বিল নিয়ে প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে আসাম। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করে, রাস্তা অবরোধ করে। এই বিলে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যে সব অমুসলিম ভারতীয়রা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা ৬ বছর বসবাস করার পর নাগরিকত্বের আবেদন করলে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অনাপ-নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—এই বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীরা অসমে ঢুকতে পারবে না, অনাপ-নেতারা আরও বলেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরা যেসব সভা ও অনুষ্ঠানে যাবেন সেখানে তারা বিক্ষোভ দেখাবেন, তাঁদের দাবি—এই বিল প্রত্যাহার করতে হবে, সংখ্যালঘু মুসলমানদের অসমে বসবাস করতে দিতে হবে, নাগরিকত্ব বাছাই করতে গিয়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা সর্বানন্দ সোনোওয়ালকেও অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। এই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন—আরএসএস নেতা কুমিল্লার তথাগত রায়। যাই হোক পরিস্থিতি এখন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্যগুলোতে বিজেপি নেতৃত্ব হাতের বাইরে চলে গেছে, এই বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে মোদী কী করে শুধু একটি আবেদন জানিয়ে মোকাবিলা করবেন—সে ব্যাপারে রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীন হবার পরই ১৯৬০ সালে আসাম থেকে বাঙালি হটাও প্রথম শুরু করেন আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী চালিয়া। তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়। ড. রায় সাবেক বিরোধী দলনেতা জ্যোতি বসুকেও ডেকে বলেছিলেন—তোমরা তো কথায় কথায় বন্ধ করো। এবার একটা বন্ধ কর আসাম থেকে বাঙালি হটাও-এর প্রতিবাদে। কংগ্রেসদল এই বনেধ সমর্থন করবে। আমি তো করবই। বামপন্থিরা বন্ধ করেছিল, আসাম থেকে বাঙালি খেদাও বন্ধও হয়েছিল; কিন্তু পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়। দু’বছর আগে সোনোওয়াল যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন আবার বাঙালি হটাও শুরু করেন তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসাম-কোচবিহার সীমান্তে গিয়ে সভা করে আসামবাসীর উদ্দেশে বলেন যে, আপনারা পশ্চিমবঙ্গে আসুন, আপনাদের দেখভালের ব্যবস্থা আমি করব। এখানেই পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠে মমতার ভোট ব্যাংকের জন্য। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র মনে করেন শান্ত এই ছোট্ট প্রদেশটিকে অশান্ত করে তুলেছেন ত্রিপুরার সাবেক রাজ্যপাল তথাগত রায়। বর্তমানে তিনি মেঘালয়ের রাজ্যপাল গোটা উত্তর-পূর্ব রাজ্যে অশান্তির মূলনেতা হলেন আরএসএস এর সাধারণ সম্পাদক আর মাধব। বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরা রাজ্যের সম্পর্ক খুবই ভালো, মনমোহন ও হাসিনার চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় সরাসরি রেল ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে, এখন এই পরিস্থিতিতে অশান্তির ঢেউ গিয়ে পড়বে বাংলাদেশের কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে। এর দায়িত্ব কি সাউথব্লক নেবে?

n লেখক :ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক