আপনার শিশুকে সুরক্ষিত রাখুন

শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার অহরহ খবর প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে খবরের কাগজে। বীভত্স খবরগুলো কিছুদিন ঝড় তোলে ফেসবুক নিউজফিডে, আমরা ব্যানার হাতে দাঁড়াই মানববন্ধনে, থানায় মামলা দায়ের হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, তদন্তের চক্রে মুখ থুবড়ে পড়ে সুষ্ঠু বিচার। তারপর আবার নতুন ধর্ষণের তাজা খবর আসে, আর পুরাতন ইস্যু চাপা পড়ে যায়।

২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। আইনে শাস্তির নীতিমালা থাকলেও নেই সঠিক প্রয়োগ। ফলে শিশু যৌন হয়রানি  নির্মূল হওয়ার বদলে বেড়েই চলছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, যৌন নিপীড়নের শিকার শতকরা ৫ ভাগ ছেলে শিশু, আর শতকরা ৯৫ ভাগ মেয়ে শিশু। শিশুদের যৌন হয়রানির মধ্যে ধর্ষণ ছাড়াও রয়েছে তাদেরকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা, বলাত্কার, স্পর্শকাতর অঙ্গ ও যৌনাঙ্গে অসত্ উদ্দেশে স্পর্শ করা।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের হিসেব মতে, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাছাড়া ২০১৫ সালে ৫২১ জন শিশু, ২০১৬ সালে ৪৪৬ জন শিশু, ২০১৭ সালে ৫৯৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৮ জন শিশু। ৫০ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৬ জন শিশু। ধর্ষণের শিকার ২২ জন শিশু প্রতিবন্ধী।

আপনার ছটফটে প্রাণবন্ত সন্তান হঠাত্ করেই চুপচাপ হয়ে গেল কেন? বিশেষ কাউকে দেখলেই তার গলা শুকিয়ে যায় কেন? সে দৌড়ে গিয়ে ঘরের কোণে লুকায় কেন? তার হাস্যোজ্জ্বল চোখে অসহায়ত্বের ছাপ কেন? তার গায়ে কাটাছেঁড়ার/পোড়ার দাগ কেন? তার শরীর ফুলে আছে কেন? রাতে ঘুমের ঘোরে সে ভয়ে চিত্কার করে আপনার বুকে আশ্রয় খোঁজে কেন? ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন আপনার সন্তানের গতিবিধি। তার হাঁটতে, চলতে, বসতে সমস্যা হচ্ছে না তো? বয়সের তুলনায় অত্যাধিক যৌন আবেদন বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করছে না তো? পূর্বে বিছানায় প্রস্রাব করার অভ্যাস না থাকা সত্ত্বেও এখন সে বিছানায় প্রস্রাব করছে না তো? প্রতিনিয়ত ধর্ষিত শিশুরা প্রস্রাব আটকে রাখতে পারে না। ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ আসে।

ধর্ষণের শিকার শিশুরা নানা রকম মানসিক সমস্যায় ভোগে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পড়াশোনা থেকে মন উঠে যায়। সবার থেকে আলাদাভাবে একাকী থাকতে চায়। জীবন তাদের কাছে বিষিয়ে ওঠে। তারা নিজেদেরকে অন্য সবার থেকে নিচু ভাবতে শুরু করে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার সন্তানকেও কোনো পিশাচ দিনের পর দিন ভোগ করছে না তো? যদি মনে হয় আপনার শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তবে শান্ত মাথায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। তার থেকে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনুন। তার সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না যাতে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যৌন নিপীড়কের সঙ্গে শিশুর সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন।  প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিন।

শিশুরা যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় (স্কুল, কলেজ, রাস্তা-ঘাট, বাড়ি) যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে। কাছের মানুষের কাছেই তারা বেশি লাঞ্ছিত হয়। তাই কাজের লোক, ড্রাইভার, কামবিকৃত মানুষ কারো কাছেই আপনার সন্তানকে বেশি সময় রেখে দেবেন না। সন্তানের খেয়াল রাখুন। শিশুকে কারো কাছে একাকী রেখে গেলে বার বার ফোন করে তার খোঁজ নিন। ফেডোফাইলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্বারাও শিশু যৌন হয়রানি ঘটে থাকে। ‘ফডোফিলিয়া’ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ফেডোফাইল বলা হয়। ফেডোফাইলে আক্রান্ত ব্যক্তির শিশুদের প্রতি যৌনাসক্তি থাকে। তারা শিশুদের বিকৃতকামভাবে হয়রানি করে থাকে। তারা হতে পারে আপনার শিশুর অতি নিকটতম আপনজন। তাদের থেকে শিশুকে দূরে রাখুন।

নিপীড়নের শিকার শিশুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তাদের মানসিক বিপর্যয় ঘটে। বড় হয়ে তাদের অনেকেই শিশু যৌন নিপীড়ক হয়ে উঠে। যৌন নিপীড়নের শিকার মেয়ে শিশুরা পুরুষ জাতিকে ঘৃণা করতে শুরু করে। নিপীড়কের প্রতি শ্রদ্ধা আজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলে। অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে তারা বেড়ে উঠে।

আপনার সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। আপনার অসাবধানতাই আপনার সন্তানের জীবন থেকে কেড়ে নিতে পারে বুক ফুলিয়ে বাঁচার স্বপ্ন। একরাশ অন্ধকার এসে গ্রাস করতে পারে আপনার সন্তানের নিষ্পাপ জগত্টাকে। আপনার সন্তানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আপনার। আপনার হেয়ালিপনা যেন আপনার সন্তানের মৃত্যুর কারণ না হয়।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়