মাদকদ্রব্য সিসা উঠতি বয়সীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাজধানীর বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ সিসার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলেও এতোদিন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারত না মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে নতুন মাদকদ্রব্য আইনে সিসাকে মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে মাদক সম্পর্কিত অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ কার্যকর হয়েছে।
আর এরপর থেকেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে সিসা বারে অভিযান। শনিবার রাতে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ধানমন্ডির একটি সিসা বারে অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর তিনজনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় বারের মালিকসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এটি অভিজাত এলাকায় সিসা বারে অভিযানের প্রথম মামলা।
নতুন আইনে সিসাকে মাদকদ্রব্যের ‘খ’ শ্রেণির তালিকায় রেখে সিসার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সিসা অর্থ বিভিন্ন ধরনের ভেষজের নির্যাস সহযোগে ০.২ শতাংশে ঊর্ধ্বে নিকোটিন এবং এসেন্স ক্যারামেল মিশ্রিত ফ্রুট স্লাইস সহযোগে তৈরি যে কোনো পদার্থ।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খোরশিদ আলম বলেন, এতদিন সিসা মাদকের তালিকায় ছিল না। সিসা মাদক জাতীয় দ্রব্য নয়, তবে এটির সঙ্গে নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য মেশানো হলেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে মর্মে কয়েক বছর আগে আদালতের একটি নির্দেশনা ছিল। ফলে আমরা অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতাম না। এখন ব্যবস্থা নিতে পারছি। ইতোমধ্যে আমরা অভিযান শুরু করেছি। এর ফলে অনেক সিসা ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা বন্ধ রেখে আত্মগোপনে চলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন মাদক আইনে সিসার পরিমাণের ওপর তিন ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দশ বছরের সাজা। এরমধ্যে মাদকদ্রব্যের পরিমাণ এক কেজি অথবা লিটার বা তার কম হলে অনূর্ধ্ব এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। আর মাদকদ্রব্যের পরিমাণ এক কেজি অথবা লিটারের বেশি এবং পাঁচ কেজি বা লিটারের কম হলে অনূর্ধ্ব ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড এবং পরিমাণ পাঁচ কেজি বা লিটারের বেশি হলে অনূর্ধ্ব ৫ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বিধান রাখা হয়েছে।
অভিজাত এলাকায় অভিযান সম্পর্কে মোহাম্মদ খোরশিদ আলম বলেন, আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি, ধানমন্ডি ৭/এ রোডের এইচটুও লাউঞ্জে নিষিদ্ধ মাদক সিসা বিক্রি হয়। তারপর অভিযানে গিয়ে লাউঞ্জে কোনো সিসার অস্তিত্ব বা পরিবেশনের চিত্র পাওয়া যায়নি। পরে লাউঞ্জের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায় সেখানে দিনভর সিসা বিক্রি হয়েছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে হঠাত্ করেই তারা পরিবেশন বন্ধ করে দেয়। পরে ফুটেজ দেখে আবার শুরু হয় অভিযান। এ সময় লাউঞ্জের রান্নাঘর থেকে ৭৫০ গ্রাম সিসা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও সিসা খাওয়ার বিভিন্ন উপকরণ ও চার সেট হুক্কা জব্দ করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সূত্র জানায়, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, মগবাজার, পরীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুইশ’র বেশি সিসা লাউঞ্জ রয়েছে। অনেক অভিজাত হোটেলেও মদের লাইসেন্সের আড়ালে অনেকে সিসার ব্যবসাও পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর এমনকি জেলা ও উপজেলা শহরেও সিসা লাউঞ্জ গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব সিসা লাউঞ্জের বেশির ভাগ গ্রাহক নামি-দামি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সের যুবক-যুবতী। এ বিষয়ে যথাযথ আইন না থাকায় এত দিন সিসা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
সিসার ভয়াবহতা :মাদক সিসা। প্রাচীন হুঁকার নগর সংস্করণ। নিকোটিনের প্রভাব থেকে রেহাই পেতে হুঁকার উদ্ভব হয়েছিল। এখন সেই হুঁকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে সিসার নিকোটিনকে ভিন্নভাবে উপভোগের কাজে। বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হুঁকা বা সিসা। তামাক ও আফিমের সঙ্গে কথিত ফলের নির্যাস মিলিয়ে হুঁকা টানা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সিগারেটের চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর এ সিসা। সিসা ব্যবহারকারীদের অধিকাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এরা হুঁকার পাইপ একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ধূমপান করে। পানির মধ্যে দিয়ে তামাকের ধোঁয়া সেই পাইপ দিয়ে টেনে নেওয়া হয়। সিগারেটের চাইতে এই হুঁকা ২.৫ গুণ বেশি পরিমাণ নিকোটিন, ১০ গুণ বেশি কার্বন মনোস্কাইড, ২৫ গুণ বেশি টার এবং ১২৫ গুণ বেশি ধোঁয়া সরবরাহ করে। একবার সিসা গ্রহণে যে পরিমাণ নিকোটিন দেহে প্রবেশ করে তা ১০০টি সিগারেটের সমপরিমাণ। সিসার দাম স্বাদভেদে পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকা। এ কারণে অনেকে দল বেঁধে এসে সিসা সেবন করেন। এতে খরচও কম পড়ে। এ সব বারে বিভিন্ন ফ্লেভারে সিসা পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে লিমোরা ডিলাইট, পান সালসা, অরেঞ্জ কাউন্টি, ওয়াইল্ড মিন্ট, কিউই, ট্রিডল আপেল, চকোলাভা, ক্রেজিকোয়ারি, ব্লুবেরিস।