আফগান-মার্কিন শান্তি আলোচনা কত দূর?

চিরস্থায়ী যুদ্ধের দেশ যেন আফগানিস্তান। চির স্বাধীন দেশ হিসেবে ইতিহাসে এর নাম আছে। এখন চির অধীন হিসেবে দেশটির নাম পাকাপোক্ত হতে চলেছে। সেই সাথে অবশ্য চলছে স্বাধীনতাপ্রিয় আফগান জনগণের নিরন্তর মুক্তি সংগ্রাম। ইতিহাসের অনেক বাঁক অতিক্রম করে মধ্যযুগে বর্তমান আফগানিস্তানের মানচিত্র স্থায়িত্ব অর্জন করে। ভারতে ব্রিটিশ শাসন আমলে তিন তিনবার আফগান জনগণের বীরত্বের কাছে ব্রিটিশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। অপরদিকে পরাক্রমশীল রুশ সাম্রাজ্য এবং ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝখানে এর অবস্থান হওয়ায় ‘বাফার ষ্টেট’ হিসেবে স্বাধীনতা সংরক্ষণে আফগানিস্তান সুবিধাজনক অবস্থান ভোগ করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত সাম্রাজ্য ত্যাগ করলে নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়। রুশ সাম্রাজ্য ততদিনে সোভিয়েত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। সোভিয়েতরা প্রথমত আফগান এজেন্টদের মাধ্যমে দেশটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে সোভিয়েত বাহিনী ১৯৭৯ সালে দেশটি সরাসরি দখল করে নেয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় দেশটি সোভিয়েত কবল থেকে মুক্ত হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত শেষ সেনাটি আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। কিন্তু শতধা-গোত্র-বিভক্ত আফগানিস্তানে অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলতেই থাকে। ১৯৯৫-৯৯ সালে তরুণ তালেবানরা ইসলামের নামে দেশটিতে ক্ষমতাসীন হয়। কিন্তু তাদের এ শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তারা গোটা বিশ্বব্যাপী ইসলামের জন্য সন্ত্রসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে বিপদে পড়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে নির্মম আক্রমণ চালানোর জন্য লাদেন অভিযুক্ত হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আলটিমেটাম দেন। তালেবান প্রেসিডেন্ট মোল্লা ওমর তা প্রত্যাখ্যান করেন। ২০০১ সালের শেষের দিকে মার্কিন তথা পাশ্চাত্য শক্তি আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং অবশেষে তা দখল করে নেয়। ২০০২ সালে হামিদ কারজাইকে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন দখলদারির বিরুদ্ধে আফগান জনগণের বিভিন্ন অংশ যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত তলেবানরা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। বিগত ১৭ বছর ধরে এ প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে শান্তির প্রয়াস যে পরিলক্ষিত হয়নি তা নয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্র, নেতৃত্বের পরিবর্তন ও গোত্রসমূহের সমন্বয়ের মাধ্যমে আফগান জনগণকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যুদ্ধ নিরসনে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ রকম সর্বশেষ শান্তি আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর।  সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘসময় ধরে এই জটিল ও কুটিল আলোচনা অব্যাহত থাকে। আফগানিস্তানে চূড়ান্ত শান্তি ও সমঝোতার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ সদিচ্ছা ব্যক্ত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করার পরেও লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় আলোচনার মাধ্যমে সম্মানজনক রাজনৈতিক সমঝোতা অর্জন করতে চায়। অপরদিকে শক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটাতে না পারার কারণে তালেবান যোদ্ধারাও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে চায়। যুদ্ধ অবসানে এ ধরনের শান্তি প্রয়াস যে অত্যন্ত দুরূহ তা বলাই বাহুল্য। উভয়পক্ষকে দীর্ঘদিন ধরে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আলোচনার টেবিলে আনার কৃতিত্ব দাবি করছে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। আলোচনা বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন জালমে খলিলজাদ। অনুষ্ঠিত আলোচনা শেষে আরব আমিরাতের সরকারি বার্তাসংস্থা জানায়, সকল পক্ষের জন্য সমান সম্মানজনক সমাধানের চেষ্টা চলছে। শান্তি আলোচনায় সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং আরব আমিরাতের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন প্রতিনিধি তার টুইটার একাউন্টে মন্তব্য করেন যে, ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আফগানিস্তানের অব্যাহত সংঘর্ষ নিরসনে এই আন্তঃরাষ্ট্রিক আলোচনা অবদান রাখবে। আলোচনায় তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ পৃথক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেন, উভয়পক্ষের সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর আবারও আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য যে, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী আবুধাবী বৈঠকটি তিনদিনের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। দুইদিন পরে আলোচনাটি কেন ভেঙে গেল তা জানা যায়নি। তবে কূটনীতিক মহল অনুমান করছেন যে, অপেক্ষমাণ আফগান সরকারকে আলোচনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানাতে তালেবানদের আপত্তি থাকায় বৈঠকটি অব্যাহত রাখা যায়নি। তালেবান কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছেন যে, তারা শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই আলাপ-আলোচনা করতে চায়। তারা একটিমাত্র বিষয় আলোচনায় আগ্রহী আর তা হলো অনতিবিলম্বে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাদের প্রত্যাহার। তালেবান মুখপাত্র আরো বলেন যে, শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনীর আফগানিস্তান দখল এবং দ্রুত সেখানে তাদের অবস্থানের অবসান ঘটানো দরকার। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা বৈঠকে যেসব বিষয় উত্থাপন করেছে তা হলো— ১. কাবুল প্রশাসনের সঙ্গে তালেবানদের সরাসরি আলোচনা। ২. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং ৩. ভবিষ্যত্ সরকার গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান । তালেবান প্রতিনিধি এসব বিষয়কে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করেন। বৈঠকে তালেবানরা বেসামরিক জনগণের উপর মার্কিন বাহিনীর নির্বিচার বোমা বর্ষণের তথ্য প্রমাণাদি তুলে ধরেন এবং অবিলম্বে তা বন্ধের দাবি জানান। মার্কিন পক্ষ বেসামরিক জনগণের মৃত্যুর জন্য উল্টো তালেবানদের দায়ী করেন। তারা আরো বলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং অন্যত্র তালেবানদের আক্রমণে এসব মৃত্যু ঘটছে। তালেবান প্রতিনিধি বৈঠকে আরো অভিযোগ করেন যে, মার্কিন কর্তৃপক্ষ যুদ্ধবন্দি এবং জেলে আটক তালেবানদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছে না। শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে তালেবানরা দুইজন বন্দিকে মুক্তিদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের একজন হচ্ছেন, মার্কিন প্রফেসর কেভিন কিং (৬০) এবং টিমথি উইক্স (৪৮)। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকে বন্দুকধারীরা তাদের অপহরণ করে। মার্কিন প্রতিনিধি প্রধান খলিলজাদ আলোচনা শেষে পাকিস্তান গমন করেন। সেখানে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজোয়াকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং শান্তি আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শান্তি আলোচনা আয়োজনে তাঁর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, পাকিস্তান শান্তি আলোচনা সফল করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ অবশ্য শান্তি আলোচনায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন।

সরাসরি শান্তি আলোচনা শুরু না করলেও এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৬  সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা ঘোষণা করেন। ঘোষিত পরিকল্পনা মোতাবেক ২০১৪ সালের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ সমাপনের কথা। ২০১৫ সালে সেখানে ৯৮০০ সেনা মোতায়েন থাকবে। তারা আফগান সেনাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করবে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তানে মার্কিন কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার জন্য পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি সম্পাদনের অপরিহার্যতার কথা বলেন। পরবর্তীকালে নির্বাচিত নতুন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে, মার্কিন আফগান নীতিতে আরো আগ্রাসী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি সৈন্য প্রত্যাহারের পরিবর্তে আরো সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয়। প্রেসিডেন্ট আরলিংটনে এক সেনা সমাবেশে বলেন, সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বাস্তব অবস্থার উপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া যায় না। পাকিস্তানের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তিনি ভারতকে আফগানিস্তান পুনর্গঠনে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহবান জানান। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আফগান জনগণের উপর সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয় পূর্বাঞ্চলীয় নানগড়হার প্রদেশে। এই বোমাকে সকল বোমার মা বলে অভিহিত করা হয়। কারণ অপারমাণবিক বোমার মধ্যে এর চেয়ে বিধ্বংসী বোমা আর নেই। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তালেবানদের আক্রমণের প্রকোপ এবং সেনা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সেনাশক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনার সদিচ্ছা তীব্রতর করেছেন। কূটনীতিকরা পরিবর্তিত মার্কিন সিদ্ধান্তকে ‘স্টিক এন্ড ক্যারট’ নীতির সাথে তুলনা করেছেন। অতি সাম্প্রতিককালে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে অনেকে আশান্বিত হয়েছেন। আফগানিস্তানে এ রকম সিদ্ধান্তের জন্য হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

দৃশ্যত মনে হচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন আফগানিস্থান থেকে সসম্মানে পশ্চাদপসরণের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তবে অস্থির ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণে অক্ষমতা শান্তির পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে বলে কূটনীতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘায়িত অমীমাংশিত এই যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন জনমত প্রবল হয়ে উঠেছে। এই পর্যন্ত ২২ শ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও ২০ হাজার। ১৭ বছরব্যাপী এই যুদ্ধে আঞ্চলিক মেরুকরণ এতটাই বহুমুখী ও জটিল হয়েছে যে সহজে এর সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে। আমিরাতে আমরা যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে দেখলাম তা আফগান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মার্কিনিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একটি শক্তিশালী এবং সক্রিয় পক্ষ-ভারত সে আলোচনায় অনুপস্থিত। আফগান সংকটের প্রথম থেকেই ভূরাজনৈতিক কারণে সেখানে ভারত প্রবলভাবে তার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চির বৈরিতা তাদেরকে সেখানে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই ভূমিকা রাখতে উদ্বদ্ধ করছে। পাকিস্তান তার সীমান্ত অঞ্চল বিশেষত বেলুচিস্তানে ভারতের প্ররোচনায় বোমা হামলা এবং উপজাতীয়দের বিভাজনে ভূমিকার অভিযোগ করে আসছে। ভারত তার বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক স্বার্থে আফগানিস্তানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। যুদ্ধ বা কূটনীতি সর্বত্রই ভারতের অনিবার্য ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা ভারতের অংশগ্রহণ ব্যতীত সব সময়ই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার শর্তে বৃহত্ শক্তি তথা ন্যাটো, রাশিয়া এবং ইরানের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের উচিত সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সামগ্রিক শান্তির অন্বেষায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা।

n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়