ব্রিটেন, ব্রেক্সিট এবং একটি চমত্কার কারি তৈরির যুদ্ধ

একটি অতি দক্ষ কাজকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন, সম্মান করেন?

আমরা প্রায় সবাই মনে করি যে চিকিত্সক এবং বৈমানিকরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং তাদের এমন ধরনের দক্ষতা রয়েছে—যা অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু যিনি সবজি-কারি তৈরি করেন, তার ব্যাপারে মানুষের ভাবনাটা আসলে কী?

ব্রিটিশ রাজনীতিকরা ব্রিটেনের অভিবাসন পলিসি তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন উচ্চতর দক্ষ কর্মীদের ব্যাপারে। এখন প্রশ্ন হলো, উচ্চতর দক্ষ কর্মী নির্ণয়ের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করেন তারা? ব্রেক্সিটকে সামনে রেখে তারা অবশ্য এটারও মীমাংসা করছেন যে, সারা বিশ্বের ব্যাপারে ব্রিটেনের ভূমিকা আসলে কী হবে? 

ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হিসেবে ব্রিটেনের এই সম্মতি রয়েছে যে, ইইউ-এর ভেতরে মানুষ অবাধ চলাচল করতে পারবে। এর ফলে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক জাতীয় দেশগুলো থেকে যে কেউ যুক্তরাজ্যে এসে কাজ করতে পারছেন। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অনেক অভিবাসীই ব্রিটেনের হোটেল, গৃহসেবামূলক এবং নির্মাণজাতীয় কাজ খুঁজে নিচ্ছেন।

এ ছাড়াও, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের বাইরে থেকে বিশেষ করে এশিয়ার অনেক দেশ থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীরা সহজেই ঢুকতে পারছেন যুক্তরাজ্যে, যাদের জন্য অভিবাসন আইন অনেক বেশি কঠোর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, অসংখ্য অভিবাসন-প্রত্যাশীরা মনে করেন যে, তারা যদি কোনোভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে পারেন তবে তারা কমপক্ষে ৩৫ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩৮ লাখ টাকা) প্রতি বছর আয় করতে পারবেন।

রেস্তোরাঁয় সবজি-কারি রান্নার জন্য একজন শেফ তথা রাঁধুনি লন্ডনের ব্রিক লেনের মতো বিখ্যাত এলাকায় যথেষ্ট উচ্চবেতন পেয়ে থাকেন। এসব শেফ বেশিরভাগই এসেছেন বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে। কিন্তু এখন অনেক রেস্তোরাঁ মালিক তাদের রান্নার কাজের জন্য এশিয়ার অভিবাসীদের পরিবর্তে কাজের প্রস্তাব দিচ্ছেন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন-ভুক্ত দেশের নাগরিকদের। এর ফলে এখন অসংখ্য ইউরোপীয়ান শেফ শিখতে বাধ্য হচ্ছেন কী করে মশলাযুক্ত ভিন্দালু কারি কিংবা চিংড়ি মালাই কারি রান্না করতে হয়।   

অভিবাসনের লাগাম টেনে ধরার জন্য ব্রিটিশ সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে যে গণভোট হয়েছে, তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বহিরাগতদের ভেতরে। গণভোটের মাধ্যমে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে অভিবাসীদের স্রোতে ভাটা পড়বে—এ কারণেও অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিতে।

গত বছর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্যবসায়ী নেতাদের বলেছেন যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাবার পর ইইউ-ভুক্ত দেশের নাগরিকরা ব্রিটেনে প্রবেশের জন্য ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাবেন না। সমপ্রতি ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ বলেছেন যে, ৪০ বছরের ভেতরে এটা ইমিগ্রেশনের জন্য সবচাইতে বড় ধাক্কা।

মিস্টার জাভিদ, যাকে গণমাধ্যমে প্রায়শই উল্লেখ করা হয় ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তিনি দ্বিতীয় প্রজন্মের পাকিস্তানি বংশোদভূত অভিবাসী। তিনি বলেন, ‘অভিবাসন আমাদের দেশের জন্য ভালো নিশ্চয়ই। কারণ, এটি আমাদের অসংখ্য দিক থেকে শক্তিশালী করে। আমি নিজেই দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী। এবং আমি যদি আমার অভিবাসী বাবা-মায়ের দিকে তাকাই, দেখতে পাই এই দেশকে তারাও নানান ভাবে সহযোগিতা করেছেন।’

বস্তুত, অভিবাসন পলিসিকে যেভাবে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, তার চূড়ান্ত ফলাফল ভালো নয়। এতে করে সামগ্রিকভাবে অভিবাসী কমবে না, বরং লো-স্কিলড তথা অদক্ষ অভিবাসীর স্রোত বেড়ে যাবে। অন্যদিকে এর ভেতরে রয়েছে ডানপন্থী অনেক উপাদান। আরো একটি বিশেষ ঘটনা হলো, ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে পার্লামেন্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভোট হারানোর ভয়ও সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।   বিরোধী দল লেবার পার্টি এই সুযোগে কনজারভেটিভ পার্টিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের চেষ্টা করছে।  বিরোধী নেতা জেরেমি করবিন নির্বাচন চাইছেন নতুন করে।

সব মিলিয়ে ব্রিটেনের খুব অল্প সংখ্যক নাগরিকই ব্রেক্সিটের ‘সুমিষ্ট স্বাদ’ গ্রহণ করতে পারছেন। বরং এটা নিয়ে ব্রিটেনের চলমান রাজনৈতিক জটিলতা আরো বেশি ঘনীভূত হচ্ছে।

(ইংরেজি থেকে অনুবাদ :তাপস কুমার)

n লেখক : এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের  সাবেক সঞ্চালক