ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাইরে কোথাও গেলে অনেকসময় দেখতাম যানবাহন থেকে নেমে হঠাত্ কেউ একজন দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বাবার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। বাবাও তাদের সঙ্গে স্নেহমাখা স্বরে কথা বলছেন। কিংবা বাবাকে দেখে অনেকে সাইকেল থেকে নেমে সালাম দিয়ে তারপর যাচ্ছেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম, বাবা এরা কারা? বাবা উত্তরে বলতেন, এরা আমার ছাত্র। এই শ্রদ্ধা, সম্মান আর নৈতিকতার ব্যাপারগুলো চলে আসে সেই ছোটবেলা থেকেই। প্রতিটা মানুষ প্রাথমিকভাবে এই ব্যাপারগুলো তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই শিক্ষা নেয়।
কিন্তু বর্তমান সময়টা যেন পুরোটাই স্রোতের বিপরীতে চলছে। এখনকার সময়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থী শ্রদ্ধা-সম্মান আর নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই ছাড়া বেড়ে উঠছে। শিক্ষক ও বড়দের যথাযথ শ্রদ্ধা-ভক্তির ব্যাপারগুলো যেন এ প্রজন্মের প্রায় শিক্ষার্থীদেরই স্পর্শ করে না। তাদের মধ্যে যেন শ্রদ্ধা, ভক্তি আর নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারগুলো নেই বললেই চলে। কাঁধে ব্যাগ ভর্তি গাদা গাদা বই নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, ক্লাস শেষে কোচিং, কোচিং শেষে বাসায় এসে আবার প্রাইভেট! যেন এসব শিক্ষার্থীর দম ফেলার ফুরসত নেই। একাডেমিক কিছু বাংলা মাধ্যমের বইয়ের উপস্থিতি আর বাকিগুলো সব ইংরেজি মাধ্যমের বই। যার ফলে সিলেবাসগুলোতে যেমন নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কীয় কোনো বই নেই তেমনই পরিবার থেকেও এসবের প্রতি নেই তেমন কোনো গুরুত্ব।
অভিভাবকদের তাগাদা একটাই ক্লাসে সন্তানকে প্রথম হতে হবে, পরীক্ষায় জি.পি.এ পাঁচ পেতে হবে। শুধু তাই নয়, অভিভাবকরাই ঠিক করছেন সন্তান বড় হয়ে কী হবে। একেকজন শিক্ষার্থীকে যেন যন্ত্রমানব তৈরির উদ্দেশে উঠেপড়ে লেগেছি আমরা! তাদের বড় বড় ডিগ্রিধারী বানাবেন, চিকিত্সক বানাবেন, প্রকৌশলী বানাবেন সবই ঠিক আছে কিন্তু তাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের শিক্ষাটা কতটুকু দিতে পারছেন সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছেন?
নেশায় আসক্তি, মাদক চোরাচালান, চুরি-ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ধর্ষণসহ খুনের মতো বড় বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তরুণদের মধ্য থেকেই। একবার ভাবুন তো, এই ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা আসলে কারা! তারা কিন্তু আমাদের পরিবারেরই সন্তান। এই বিপথগামী তরুণদের এ পথে ধাবিত হবার কারণ হলো তাদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার যথেষ্ট অভাব। যা থেকে তাদের বঞ্চিত হবার কারণ হলো পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতার ব্যাপার শিক্ষা না দেওয়া। যার ফলে ঘটছে সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণতা।
শুধু তাই নয়, অনেক সময় আত্মহননের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ঝগড়া, অপ্রাপ্তি, প্রতিশোধ, অপমানবোধ, পড়াশোনার চাপ ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়াটা কতবড় একটা সামাজিক অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত একবার চিন্তা করুন তো! এই আত্মহত্যা কি আদতে কোনো সঠিক সমাধানের পথ! তার এই আত্মহত্যা থেকে পরিবার, সমাজ ও দেশকে কী বার্তা দিয়ে গেল? সবার মধ্যে যদি পারিবারিকভাবে নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাটা জারি থাকত তাহলে হয়ত আত্মহননের মতো এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই তারা নিতে পারত না।
এমন অবস্থার পেছনে পরিবারের পাশাপাশি একশ্রেণির শিক্ষকেরও দায় নেহায়েত কম নয়। ক্লাসে সিলেবাসের বাঁধা ধরা পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য নৈতিক শিক্ষার বিষয়টাও মাথায় রাখা জরুরি। ভয়-ভীতি নয়, বরং বাবা-মার পরেই যেন একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নিরাপদ মনে করে, তাদের সমস্যা ও ইচ্ছার কথা মন খুলে জানাতে পারে সে পরিবেশ কিন্তু শিক্ষকদেরই তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর মাঝে যদি সুকুমারবৃত্তির চর্চা, সুস্থ দেশীয় সংস্কৃতির চর্চাসহ নীতি-নৈতিকতার চর্চা না থাকে তাহলে সে একজন সু-নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে কীভাবে?
সমাজ তথা দেশে সংঘটিত নানা ধরনের অপরাধ, অপসংস্কৃতিসহ নানাবিধ নীতিগর্হিত কাজে অনেক তরুণের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যাওয়ার কারণ হলো নৈতিক শিক্ষার অভাব; যা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সচেতন হতে হবে শিক্ষকমহলকে। সচেতন হতে হবে পরিবারকে, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়