উখিয়ায় অস্তিত্ব সংকটে খাল নদী ছড়া!

কক্সবাজারের সর্ব দক্ষিণে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ২৬১.৮০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উখিয়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের উপর দিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রবহমান প্রায় ১৩টি খাল, নদী, ছড়া শুকিয়ে গেছে। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে গতিপথ বদলে ও পাহাড় কাটা মাটিতে ভরাট হয়ে মারাত্মকভাবে নাব্য হারাচ্ছে খালগুলো। ফলে বোরোসহ অর্থকরী ফসল উত্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চলতি বোরো উত্পাদন নিয়ে কৃষকদের মাঝে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ৪শ’ হেক্টর জমিতে বোরো উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া ৪শ’ হেক্টর বেগুন, ৩শ’ হেক্টর মরিচ, ভেন্ডি, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ অন্যান্য অর্থকরী ফসল উত্পাদনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২শ’ হেক্টর জমিতে। কৃষকদের অভিযোগ খাল, নদী, ছড়া থেকে উত্তোলিত পানি দিয়ে এসব শাক-সবজি উত্পাদন করা সম্ভব। কিন্তু চলতি মৌসুমে এসব খাল, ছড়া, নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তারা হতাশ হয়ে পড়েছে।

পশ্চিম ডিগলিয়ায় নবনির্মিত রাবার ড্যাম এলাকা ঘুরে খালের পাড়ে বসবাসরত বেশ কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় ছিল খালের পানি দিয়ে আশেপাশে জমিগুলোতে চাষাবাদ ও শাক-সবজি উত্পাদন করা সম্ভব হতো। এখন ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়েও উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে পানির স্তর অত্যন্ত নিচে নেমে গেছে বলে তারা দাবি করেন।

থাইংখালী খালের পাড়ে বসবাসরত মিয়া হোসেন (৫৫), কলিমুল্লাহ (৪৮)সহ একাধিক পরিবারের লোকজন অভিযোগ করে জানান, থাইংখালী থেকে তেলখোলা জাহালিয়াপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৮টি স্পটে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালি উত্তোলনের ফলে খালের পাড়, কৃষি জমি, বসতভিটা তছনছ হয়ে ভরাট হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী এ খালটি। ফলে এলাকার খাল সংলগ্ন জায়গাগুলোতে শাক-সবজি, তরিতরকারি উত্পাদন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালের পানি না থাকার কারণে কৃষকেরা গভীর নলকূপ স্থাপন করেও চলতি বোরো মৌসুমের জন্য বীজতলা তৈরি করতে পারছে না। এমন অভিযোগ এলাকার শত শত কৃষকের। তারা এ খালটি পুনঃখননের আওতায় এনে এলাকার রবি শস্য উত্পাদনে কৃষকদের উত্সাহিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।  তাছাড়া উখিয়ার জোয়ার-ভাটার রেজুখাল, দোছরী খাল, হরিণমারা খাল, হিজলিয়া খাল, পশ্চিম ডিগলিয়া খাল, কুমারপাড়া খাল, চাকবৈঠা খাল, বালুখালীর ছড়া, ইনানীর ছোট খালসহ প্রায় ১৩টি খাল, নদী, ছড়া এখন মরুতে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশরাফ জানান, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা আশ্রয়কে কেন্দ্র করে উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে প্রায় শতাধিক পাহাড় কেটে মাটি পাচার করা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করলেও পাহাড়ের আশেপাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা মাটিগুলো ধরে রাখার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এসব মাটি বৃষ্টির পানির সাথে বিভিন্ন খাল, ছড়া, নদীতে পড়ে নাব্য হারিয়েছে। তিনি বলেন, এসব খালগুলো পুনঃখননের আওতায় আনা না হলে চলতি বোরো মৌসুমেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, বোরো উত্পাদনের পাশাপাশি শাক-সবজি উত্পাদনের মাধ্যমে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয়দের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সে সংকটের মাঝেও যাতে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত না হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্মকর্তা মোঃ ইব্রাহিম খলিল জানান, খাল, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি অব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, কৃষক বাঁচাতে হলে খাল, নদী, ছড়া খনন করে পানির উত্স সৃষ্টি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।