বগুড়ার শেরপুরে আলু বীজ সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে যাওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বীজের অভাবে প্রান্তিক কৃষক ডিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে বার বার ধর্না দিয়েও বীজ পাচ্ছেন না। ফলে অনাবাদী থেকে যাচ্ছে আলুর ক্ষেত। এ অবস্থায় চলতি বছর আলু চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষীরা। এদিকে অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেট ইচ্ছেমত দামে আলু বীজ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তা বীজ আলু ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় দুই হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে বীজ লাগে দেড় মেট্রিক টন। সেই অনুযায়ী এই উপজেলায় বীজের প্রয়োজন তিন হাজার ৯৪ মেট্রিক টন। কিন্তু বরাদ্দ মিলেছে মাত্র এক হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। যা অর্ধেকের কম। আর এসব বীজ বিক্রির জন্য প্রায় ৪৫ জন ডিলার রয়েছে। এর মধ্যে ডিএডিসির ১৮ জন, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের আটজন ও অন্য কোম্পানির ১৯ জন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিলাররা উত্তোলন না করায় সরকারি বিএডিসির আলু বীজ এখনও বাজারে আসেনি। তাই ভালো ফলন পাওয়ার আশায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক সিড এন্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজের আলু বীজের দিকে কৃষক ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু বাজারে এই কোম্পানিসহ অন্য কোম্পানির বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে গেছে ওইসব কোম্পানির আলু বীজ। তাই ডিলার ও ব্যবসায়ীদের দোকানে দোকানে ঘুরেও বীজ পাচ্ছেন না চাষীরা। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই মিলছে তাদের কাঙ্ক্ষিত আলু বীজ। ফলে আলু চাষের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষের কথাও ভাবছেন কৃষক।
আরও পড়ুন: সিডরের ১৩ বছরেও শরণখোলায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি
উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের আলু চাষী দুলাল হোসেন, শাহ আলম, ফারুক হোসেন, আব্দুস সাত্তারসহ একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, ব্র্যাকের ৪০ কেজি ওজনের বীজ আলুর বস্তা বি-গ্রেড দুই হাজার ৮০ টাকা ও এ-গ্রেড দুই হাজার ২০০ টাকা বিক্রি করার কথা থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকায়। এরপরও চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না আলুর বীজ।
তারা আরও জানান, গেলো মৌসুমে বাজারে ভালো দাম পেয়ে কৃষক এবার আলু চাষে ঝুঁকে পড়লেও বেশি দামে বীজ কেনার কারণে একর প্রতি আট থকে দশ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়বে। তাই আগামীতে আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
কৃষকের দাবি, বীজ কোম্পানির একটি চক্রের সঙ্গে ডিলার-ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আগাম বুকিংয়ের নামে বীজ বাণিজ্য করছে। সংশ্লিষ্ট দফতরে মনিটরিং না থাকার সুযোগ নিয়ে মুনাফাখোর ওই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে বাজারে আলু বীজের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। কৃষকদের এসব অভিযোগ খোদ ডিলাররাও স্বীকার করেছেন।
জানতে চাইলে ব্র্যাকের ডিলার মো. রফিকুল ইসলাম বীজ সঙ্কটের কথা জানিয়ে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী এ উপজেলায় বীজের বরাদ্দ নেই। বরং বরাদ্দ আরও কমেছে। তাই এবার শেষ পর্যন্ত আলু বীজের সঙ্কট থেকেই যাবে। এছাড়া বীজের দাম বাড়ার পেছনে সাব-ডিলারদের দায়ী করে বলেন, প্রত্যেক বীজ ডিলার আবার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাব ডিলার (বীজ বিক্রেতা) নিয়োগ দিয়েছেন। তারা আগাম টাকা ও বুকিং দিয়ে আলু বীজ নিচ্ছেন। মূলত তারাই কোম্পানির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন।
বিএডিসি ও ব্র্যাকের আরেক ডিলার ফিরোজ উদ্দিন মাস্টার বলেন, সবেমাত্র আলু লাগানো শুরু হয়েছে। সবাই একসঙ্গে আলু লাগানোর কারণে আলু বীজের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া যেসব কৃষক আগাম বুকিং দিয়েছেন তারাই আগে বীজ পাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. শারমিন আকতার বলেন, এখানে বীজের সঙ্কট নেই। সময়মত সব কৃষকই বীজ পাবেন। দুই একদিনের মধ্যে বিএডিসির বীজ বাজারে এলে শঙ্কা কেটে যাবে। এছাড়া ডিলাররা নির্ধারিত দামের বাইরে বীজ বিক্রি করতে পারবেন না। এরপরও যারা সেটি করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইত্তেফাক/এসি