না’গঞ্জে রি-রোলিং মিলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই

হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ

কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা কাকে বলে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে নারায়ণগঞ্জের রি-রোলিং মিলে। কারখানাগুলোতে একদিকে যেমন মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও শব্দদূষণ, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে শ্রম আইন মেনে চলেন না কর্তৃপক্ষ। ফলে এখানে কাজ করতে গিয়ে হতাহত হচ্ছেন অনেকে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রম, সাপ্তাহিক ছুটি, মজুরি কাঠামো- শ্রম আইনে এসবের বিধান থাকলেও রি-রোলিং শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এসবের বালাই নেই। নেই নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র কিছুই। নেই কোনো শ্রমিকের জীবন ও চাকরির নিরাপত্তা। ফতুল্লার একটি রি-রোলিং কারখানার শ্রমিক জানান, এখানে এমন কোনো শ্রমিক নেই, যার গায়ে আগুনের ছ্যাঁকা না লেগেছে। এমনকি যে মজুরি তাদের দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত নগণ্য। এ কারণে অধিকাংশ শ্রমিক এক জায়গায় কাজ শেষ করে অন্য আরেকটি মিলে কাজ করতে বাধ্য হন। শ্রম আইনের ১০৩ ধারা অনুযায়ী, কলকারখানার শ্রমিকদের সপ্তাহে একদিন ছুটি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়াও আইনের ১১৫ ধারায় পূর্ণ মজুরিতে ১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি ও ১১৮ ধারায় ১১ দিনের উত্সব ছুটি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শ্রম আইনের ১০০ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের দিয়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না বলে নির্দেশনা রয়েছে। রয়েছে নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র দেওয়ার বিধান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার শতাধিক কারখানায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। গত চার মাসে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কারখানায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩টি। এর মধ্যে আহত হয়েছেন ২১ জন। চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর ফতুল্লার পাগলা এলাকায় অবস্থিত চাকদা স্টিল রি রোলিং মিলের চুল্লি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় ৫ জন। এ ঘটনায় বাবুল (৩০) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এরপর ২৩ নভেম্বর সোনারগাঁয়ের নয়াপুরের মুনতাহা স্টিল মিলে গলিত লোহা পড়ে ১৩ শ্রমিক দগ্ধ হন। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ২ জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি কাঁচপুরের রহিম স্টিল মিলে গলিত লোহা ছিটকে ৩ শ্রমিক দগ্ধ হয়েছে। এবিষয়ে ফতুল্লার তক্কারমাঠ এলাকার জেএস রি-রোলিং কারখানার এক শ্রমিক সমপ্রতি জানান, শ্রম আইন না মানায় আমি মালিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বহু চেষ্টা করেছি। কখনো লেবার কোর্টে, কখনো কলকারখানা পরিদর্শন কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে আবার কখনো শ্রমিক নেতাদের বাড়ি ও অফিসের দরজায়। কিন্তু কেউ রি-রোলিং মিল নিয়ে মাথাই ঘামায়নি। এ ব্যাপারে শ্রমিক নেতাদের আন্দোলন করতেও দেখা যায় না। বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবেক সভাপতি হাফিজুর ইসলাম বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় রি-রোলিং কারখানার শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আন্দোলন করি। কিন্তু রি-রোলিং কারখানায় শ্রমিক কম থাকায় জোরালো আন্দোলন করতে পারিনি যেটা গার্মেন্টসে খুব সহজে করা যায়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, গার্মেন্টসে অনেক মালিকই শ্রম আইন মানেন না। তবে এ খাতে ৪০ লাখ মানুষ কাজ করে বলে আন্দোলন দ্রুত বড় হয় যেটা রি-রোলিং কারখানায় সম্ভব হয় না। তাছাড়া রি-রোলিং এর মালিকরা শুধু শ্রম আইনই নয়, দেশের কোনো আইনই মানেন না। তারপরেও আমরা চেষ্টা করি শ্রমিকের দাবি আদায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে।