চিকিত্সা নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। অসুস্থ হইলে এই অধিকার পাইবার অধিকার রাখেন কারাগারের বন্দিরাও। প্রয়োজন হইলে হাসপাতালে লইয়াও কোনো বন্দির চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করিতে হয়। কিন্তু আমরা দেখিতে পাইতেছি, এই নিয়মের নানা ব্যত্যয় ঘটিতেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়াছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে চিকিত্সকের অনুমোদিত পদ রহিয়াছে ১২৯টি। এইসকল কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৬ হাজার ৬১৪ জন হইলেও বন্দি রহিয়াছে প্রায় ৯৫ হাজার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সহিত বলিতে হয়, এতগুলি বন্দির জন্য বর্তমানে চিকিত্সক রহিয়াছেন মাত্র আটজন। বন্দি ও চিকিত্সকের এই অনুপাতই বলিয়া দিতেছে কারা হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সাসেবার কী অবস্থা। জানা যায়, ছোটখোটো শারীরিক সমস্যার জন্যও বন্দিদের চিকিত্সা করাইতে হয় কারা হাসপাতালের বাহিরে লইয়া।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চিকিত্সকের অনুমোদিত পদ রহিয়াছে ৩৩টি। সেখানে চিকিত্সক রহিয়াছেন মাত্র একজন। বাকি ৩২টি পদই শূন্য। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক জানাইয়াছেন যে, প্রায় দুই হাজার কারাবন্দির জন্যে একজন চিকিত্সকও নাই। কারা কর্তৃপক্ষ ধার করিয়া সদর হাসপাতাল হইতে চিকিত্সক লইয়া আসেন। হাসপাতালগুলির জন্য চিকিত্সক চাহিয়া গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শতাধিক চিঠি দেওয়া হইয়াছে মর্মে জানাইয়াছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র হইতে জানা যায়, কারা হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সক নিয়োগ দিতে গত ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হইতে কড়া ভাষায় চিঠি লেখা হইয়াছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সেইখানে বলা হইয়াছে, ২০ জন চিকিত্সককে বিভিন্ন কারা হাসপাতালে যোগদান করিবার নির্দেশ দানের পরও তাহারা কাজে যোগদান করেন নাই। যেই সকল চিকিত্সক এই নির্দেশ অমান্য করিয়াছেন তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা লইতেও বলা হয় উক্ত চিঠিতে। বারবার চিঠি প্রদানের পরও চিকিত্সক পদায়ন না হইবার বিষয়টি হতাশাজনক। দেখা যাইতেছে, কারা হাসপাতালে কাজে যোগদানে অনাগ্রহ রহিয়াছে বেশিরভাগ চিকিত্সকের। বিশেষ করিয়া ঢাকার বাহিরের হাসপাতালে তাহারা যাইতে চাহেন না। চিকিত্সকরা কখনো এই শর্তে চাকরিতে যোগদান করেন নাই যে. তাহারা তাহাদের সুবিধামতো জায়গায় যোগদান করিবেন। তাহারা মানুষের সেবার মতো অতি মহত্ কাজে ব্রতী হইয়াছেন। সুতরাং এই মানসিকতা সম্পূর্ণতই চিকিত্সাসেবার পরিপন্থী। কারাবন্দিদের চিকিত্সা পাইবার মানবিক অধিকার কতিপয় চিকিত্সকদের এই সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে লঙ্ঘিত হইতেছে। স্পষ্টতই প্রায় এক লক্ষ কারাবন্দির জন্য মাত্র আটজন চিকিত্সক থাকিবার বিষয়টি কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিক নহে।
কারাগারে সবচাইতে বেশি সমস্যায় রহিয়াছেন বন্দি থাকা মানসিক রোগী ও প্রতিবন্ধী বন্দিরা। এমন বন্দির সংখ্যা প্রায় এক হাজার। তাহাদের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও বিশেষায়িত চিকিত্সা দরকার। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কারাগারগুলিতে নাই। জানা গিয়াছে, এই ধরনের চিকিত্সক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রহিয়াছে। অনেকেই মনে করেন, এই জটিলতা বহাল রাখা হইতেছে বিভিন্ন কারণে। ইহার আশু অবসান হওয়া প্রয়োজন।