মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরঝাপটার কাছে মেঘনা নদীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় মাটিবোঝাই ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ২০ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন ১৪ জন। গত সোমবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটলেও গতকাল বুধবার সকাল ৮টায় প্রশাসন উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে আবারো অভিযান শুরু হওয়ার কথা। নিখোঁজ শ্রমিকদের মধ্যে ১৭ জনের বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় এবং তিনজনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। তাদের গ্রামের বাড়িতে চলছে মাতম।
মুন্সীগঞ্জ সদরের ইউএনও ফারুক আহম্মেদ বলেন, দুর্ঘটনার সময় কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। এ কারণে দুর্ঘটনার স্থান চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছে। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের নিয়ে বুধবার দুর্ঘটনার স্থান এবং দুর্ঘটনা কবলিত ট্রলারটি শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। মুন্সীগঞ্জের প্রশাসন ছাড়াও পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিস অভিযানে অংশ নেয়।
ইউএনও জীবিত শ্রমিকদের বরাত দিয়ে জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ট্রলারে মাটি তুলে ৩৪ জন শ্রমিক নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলীর ইটের ভাটায় নিয়ে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ট্রলারে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে অন্যরা সাঁতারে প্রাণে বাঁচলেও ট্রলারটির কেবিনের ভেতরে ঘুমন্ত ২০ শ্রমিকের ভাগ্যে কি হয়েছে এখনও জানা যায়নি। তিনি জানান, ডুবে যাওয়া ট্রলারটির মালিক বক্তাবলীর জাকির দেওয়ান। এই মাটি জাকির দেওয়ানের ইটভাটায় ব্যবহারের কথা ছিল। এই ট্রলার ডুবির ঘটনায় জাকির দেওয়ান অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন বলে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা তাকে জানিয়েছেন। তবে এখনও ট্রলারের মালিক পক্ষের লোকজন দুর্ঘটনাস্থলে আসেনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জনান, মঙ্গলবার পাবনার ভাঙ্গুরা থানার ওসির মাধ্যমে ট্রলার ডুবির ঘটনা অবগত হয়ে মেঘনায় নৌপুলিশ দিয়ে সন্ধান চালায়। কিন্তু নৌ পুলিশ এরকম কোনো ঘটনার তথ্য মিলাতে পারেনি। গতকাল সকাল থেকে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়। তবে ট্রলার বা নিখোঁজ শ্রমিকদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী জাহাজ তলব করা হয়েছে। গজারিয়া ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এবং চাঁদপুরের উত্তর মতলবের সীমান্তবর্তী এলাকা এটি। দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাতের বেলায়, তাই দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে গজায়িরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান সাদী জানান, মেঘনা অনেক বড় নদী। তাই শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। ইউএনও জানান, পাবনা থেকে নিখোঁজদের ৩০/৩৫ জন স্বজন এসেছে। মেঘনার পাড়ের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই স্বজনদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
ট্রলার ডুবিতে বেঁচে যাওয়া শ্রমিক পাবনার মো. হাবিবুর রহমান ও পরশ কুমার সিং বলেন, নদীতে প্রায় এক ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর একটি বালুর জাহাজে উঠে প্রাণ বাঁচান।
শ্রমিক মামুন আলী বলেন, আমরা ১৪ জন শ্রমিক বেঁচে গেলেও কেবিনের ভেতরে থাকা ২০ জনের কেউই বেরুতে পারেনি। কনকনে শীতে অন্ধকার রাতের সেই বেঁচে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মামুন আলী বলেন, তেলের ট্যাঙ্কারটি দেখতে পেয়ে আমাদের ট্রলারের চালক বিপদ সংকেত দিয়ে ঘণ্টা বাজায়। আমরা উপরে উঠে আসার আগেই ট্যাঙ্কারটি আমাদের ট্রলারের ওপরে উঠিয়ে দেয়। যদি মঙ্গলবার ভালো করে উদ্ধার অভিযান চালানো হতো তবে হয়তো সেদিনই ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যেতো।
নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন: পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মুণ্ডুমালা গ্রামের গোলাই প্রামাণিকের ছেলে সোলেমান হোসেন, জব্বার ফকিরের ছেলে আলিফ হোসেন ও মোস্তফা ফকির, গোলবার হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-১, আব্দুল মজিদের ছেলে জাহিদ হোসেন, নূর ইসলামের ছেলে মানিক হোসেন, ছায়দার আলীর ছেলে তুহিন হোসেন, আলতাব হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-২, লয়ান ফকিরের ছেলে রফিকুল ইসলাম, দাসমরিচ গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে ওমর আলী ও মান্নাফ আলী, তোজিম মোল্লার ছেলে মোশারফ হোসেন, আয়ান প্রামাণিকের ছেলে ইসমাইল হোসেন, সমাজ আলীর ছেলে রুহুল আমিন, মাদারবাড়িয়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে আজাদ হোসেন, চণ্ডিপুর গ্রামের আমির খান ও আব্দুল লতিফের ছেলে হাচেন আলী এবং উল্লাপাড়া উপজেলার গজাইল গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে রহমত আলী, রজব আলীর ছেলে শফিকুল এবং জনৈক সিরাজ মিস্ত্রী। জীবিত উদ্ধার ১৪ জন হলেন: মামুন আলী, আ. রাজ্জাক, উত্পল, প্রদীপ, শহিদুল, কায়েস, অমূল্য, শাহ আলম, হাবিবুর, সালাম, নজরুল, কালশে, কার্তিক ও মাঝি হাবিব।