পুলিশের মধ্যস্থতায় আসামিপক্ষ ১০ লাখ টাকা দেয় বাদীপক্ষকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে। এরপর আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ড হয়ে গেল সড়ক দুর্ঘটনা। ঐ হত্যা মামলায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ আসামিকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডেও নেয়। কিন্তু মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আদালতে দাখিল করা হয়েছে দুর্ঘটনা বলে। অবশ্য বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ মামলাটি এমন করা হয়েছে—এমনটি দাবি করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেন। ঐ মামলায় খালাসপ্রাপ্ত আসামির বিরুদ্ধে ট্রিপল মার্ডারের মামলা রয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
পুলিশের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, হত্যা মামলার অনেক ঘটনা আছে। আবার বাদীর সঙ্গে আপসও হচ্ছে। তবে হত্যার ঘটনাকে দুর্ঘটনা বানিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নজির নেই।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
২০১৭ সালের ১৫ জুলাই রাত ৯টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ভবনের নিচতলায় জেএম এন্টারপ্রাইজে গাড়িচালক রুহুল আমিনকে পেটানো হয়। পরে তিনি মারা যান। ১৮ জুলাই নিহতের বাবা খোরশেদ আলম বাদী হয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় ঢাকা-কোম্পানীগঞ্জ রুটে চলাচলকারী তিশা ক্লাসিক পরিবহনের পরিচালক এবং জেএম এন্টারপ্রাইজের মালিক জামান হোসেন ভূঁইয়া ওরফে খোকন ও তার ম্যানেজার পাত্তি খোকনকে।
নিহতের বাবা অভিযোগ করেন, জামান হোসেন ভূঁইয়া ওরফে খোকনের মালিকানাধীন একটি গাড়ির চালক তার ছেলে। ১৫ জুলাই রাত ৯টার দিকে তার ছেলে গাড়ির ভাড়ার টাকা দেওয়ার জন্য টার্মিনালে খোকনের অফিসে যান। ঐ সময় ভাড়ার টাকা কম দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে আমিনকে মারধর করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় আমিন সেখানে লুটিয়ে পড়েন। পরে টার্মিনালের অন্য পরিবহন শ্রমিকেরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে নিয়ে চিকিত্সা দেন। পরে তাকে কুমিল্লার একটি বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার মির্জানগর গ্রামের বাড়িতে ঐ দিন রাতে পৌঁছে। পরদিন বিকালে তার ছেলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় তাকে দেবীদ্বার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেন জানান, ২০১৭ সালের ৫ আগস্ট পুলিশ টার্মিনাল ভবন থেকে খোকন ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিন খুনের আসামি
জামান হোসেন ভূঁইয়া ওরফে খোকনের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় তিন খুনের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৩ মার্চ গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শামসুদ্দিন প্রধান, গজারিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মাহবুব আলম জোটন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মান্নান মনার স্ত্রী লাকি আক্তার খুন হন। তিন খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় খোকনের বড় ভাই আক্তার হোসেন ভূঁইয়া ২ নম্বর এবং জামান হোসেন ভূঁইয়া ৩ নম্বর আসামি। পুলিশ দুই সহোদরসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। মামলাটি মুন্সীগঞ্জ আদালতে বিচারাধীন।
অভিযোগ প্রত্যাহারের হলফনামা
মামলার বাদী খোরশেদ আলম অভিযোগ করেন, জেলে যাওয়ার পর খোকনের বড় ভাই আক্তার হোসেন ভূঁইয়া তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছেলে মারা যাওয়ার ঘটনায় তাকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এমন প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হলফনামা দেন। হলফনামায় তিনি দাবি করেন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার তেঁতুইতলা গ্রামের নিবাসী জামান হোসেন ভূঁইয়া ওরফে খোকন ভূঁইয়া ও তার ম্যানেজার পাত্তি খোকনের বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় ৩৪/৩০২ দণ্ডবিধির একটি মামলা করেছেন। ছেলের মৃত্যুতে তিনি দিশেহারা হয়ে কোনো কারণ যাচাই-বাছাই না করে তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনেন। পরে তিনি জানতে পারেন যে, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই তার ছেলে কুমিল্লাতে যাওয়ার জন্য সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের আলম রেস্তোরাঁর সামনে পাকা রাস্তার ওপর বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় একটি অজ্ঞাতনামা সিএনজি দ্রুতগতিতে তার ছেলের পেছন দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তার ছেলে একটি ওষুধের দোকানে প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়ে গ্রামের বাড়ি মির্জানগরে চলে যায়। ১৬ জুলাই গ্রামের বাড়িতে তার ছেলে অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিত্সকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এসব বিষয় সঠিকভাবে জানার পর আসামির বিরুদ্ধে তার আর কোনো অভিযোগ নেই। মামলা থেকে আসামিদের জামিন ও অব্যাহতি পেলে বা চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলে তার কোনো অভিযোগ থাকবে না।
স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার চুক্তি
এই হলফনামার পরিপ্রেক্ষিতে আসামি জামান হোসেন ভূঁইয়া ঐ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। এরপরই পুলিশের মধ্যস্থতায় মামলার বাদীর সঙ্গে আসামি খোকনের একটি চুক্তিনামা সম্পাদন হয়। স্ট্যাম্পে দুই পক্ষের স্বাক্ষর করা চুক্তিনামায় বলা হয়, যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিষয়টি আপস-মীমাংসা করা হয়েছে। দ্বিতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি এ বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা চালাব না। দ্বিতীয় পক্ষের নিকট থেকে আমি ও আমার পরিবার ১০ লাখ টাকা নিয়েছি। এই টাকা আমার মৃত সন্তানের স্ত্রী-সন্তানদের ভাগ করে দিয়েছি। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো মামলা করব না।
পরে যাত্রাবাড়ী থানাপুলিশ ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মামলার বাদীর হলফনামায় উল্লিখিত ঘটনা তুলে ধরেছে প্রতিবেদন দাখিলকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেন। মামলার অভিযোগ থেকে জামান হোসেন ভূঁইয়া ওরফে খোকনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অজ্ঞাত সিএনজির ধাক্কায় ভিকটিম রুহুল আমিন আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে তিনি তার কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার গ্রামের বাড়ি মির্জানগরে অসুস্থ হয়ে মারা যান। অজ্ঞাত সিএনজিটিকে পুলিশ অনেক চেষ্টা করে শনাক্ত করতে পারেনি।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি