'কাজের আরো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড'

চারদিকে থমথমে পরিবেশ। মহামারি করোনা ভাইরাসে প্রিয়জনের মৃত্যু, বিভিন্ন সময় করোনা আক্রান্ত প্রিয়জনকে ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউন। বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের কাজ, সমাজের খেটে খাওয়া মানুষগুলো কর্মসংস্থান হারিয়ে বিপাকে। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে 'ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ আর্মি' নামের একটি নবীন সংগঠন। ইতিমধ্যে সংগঠনটি অর্জন করেছে বাংলাদেশের তরুণদের সর্ববৃহৎ প্লাটফর্ম ইয়াং বাংলার 'জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২০'।

চলতি বছরে করোনা মহামারীকালে মার্চ মাসেই দারিদ্র মানুষের সহযোগিতার জন্য নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গড়ে ওঠে এই সংগঠন। এই সময়ে সহযোগিতার মনোভাব থেকে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রী আয়েশা আক্তার ইতি। করোনায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ তখন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করছিলেন তিনি। জীবিকার অবলম্বন হারানো মানুষের খাবারের কষ্ট তাকে নাড়া দেয়। তখন থেকেই মনে দানাবাঁধে দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে।

তবে রক্ষণশীল এলাকার একজন মেয়ে হিসাবে ও মরণঘাতী করোনার মধ্যে কাজ করা মোটেও সহজ ছিলো না। 'তবুও সকল প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে কাজ শুরু করা'- এমনটিই জানালেন আয়েশা আক্তার ইতি।

করোনাকালীনে ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ আর্মি’ সংগঠনের যাত্রার শুরু হয়। করোনায় দুস্থ মানুষের খাবার সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মনোভাব থেকে হঠাৎ করেই শুরু করা এই কাজের পেছনের গল্পটা যেন একটু অন্যরকম।

আরো পড়ুন: ৩০ তরুণ সংগঠকের হাতে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২০

পেছনের গল্প নিয়ে ইতি জানান, 'করোনায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি, তখন গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। তখন হঠাৎ করে লকডাউন শুরু হয়। গ্রামের দারিদ্র মানুষগুলো কর্মসংস্থান হারায়। খাবার সংকট দেখা দেয় এসব দুস্থ মানুষদের। এক সকালে এক ক্ষুধার্ত পরিবারের এক নারী খাবারের জন্য আসে, যার একমাত্র ছেলে অন্যের চায়ের দোকানে কাজ করত। করোনায় কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই খাবারের কষ্টে দিন জীবন-যাপন করছে। এমনই ক্ষুধার্ত যে, বাড়িতে যদি বাসি খাবার থাকে, সেটি দেওয়া জন্য বলে। যেটা আমাকে প্রথমে নাড়া দেয়। মানুষের জন্য কিছু করা যায় কিনা, এমন মনোভাব থেকেই কাজটি শুরু করি।'

খাদ্য সংকটের কথা সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে জানিয়ে পোস্ট দেন তিনি। পোস্টটি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানান একজন। সংসদ সদস্য খুব দ্রুতই সাড়া দেন এবং ওই নারীকে সাহায্য করেন।

খাদ্য সমস্যার এই ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে ওই এলাকায় তরুণদের সাথে আলোচনা করেন ইতি। তাৎক্ষণিক শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ। পাশে দাঁড়ান তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সিনিয়র ভাই ও বোনদের অনেকে। এবার একটু বড় পরিসরে মাঠে নেমে পড়েন আয়েশা আক্তার ইতি।

তবে শুধু গ্রাম নয়, এবার একটু বড় আকারে অর্থাৎ পুরো বাংলাদেশে সহযোগিতার চিন্তা শুরু করেন। ২৫ জন ভলান্টিয়ার এর মাধ্যমে শুরু হয় তাদের কাজ। এভাবেই ১৪ জেলায় ৭০০ পরিবারের মাঝে খাদ্য সহযোগিতা দেওয়া হয়।

তবে এই পথ পরিক্রমায় চ্যালেঞ্জ কম ছিলো না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা যেনো মেয়ে বলেই। স্থানীয় অনেকে এই কার্যক্রমকে দৃষ্টিকটু হিসেবেও দেখেছেন। তবে পরিবারের সহযোগিতা ছিলো বলেই এতদূর আসা। বিশেষ করে তার বাবার ইতিবাচক মনোভাব। ইতি জানান, ‘বাবা বললেন-একটা ছেলে যে কাজ করতে পারত, সেটা তুমি একটা মেয়ে হয়েই করছো।’

ইতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের যুক্ত রয়েছেন। করোনায় দুস্থ মানুষদের সহযোগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ এবার জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন আয়েশা আক্তার ইতি। এমন একটা স্বীকৃতি কাজে আরো অনুপ্রেরণা যোগাবে বলে জানান তিনি।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ইয়াং বাংলার মত এমন এক প্লাটফর্ম থেকে দেশের তরুণদের পুরস্কৃত করার কারণে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সকলে উদ্বুদ্ধ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এই অ্যাওয়ার্ড আমার টিমকে আন্দোলিত করেছে। টিমের যারা ভলান্টিয়ার আছেন তারা আগামীতে আরো ভালো কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।'

জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড মানুষের কাছে পৌঁছানোর আরো সুযোগ করে দিয়েছে বলে জানান আয়েশা আক্তার ইতি।

চলমান করোনাকালীন মহামারিতে দুস্থদের সহযোগিতায় সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে কাজ শুরু করে ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ আর্মি। বর্তমানে সংগঠনটিতে ২৫ জন সদস্য এসব কাজের সাথে সম্পৃক্ত আছেন। আগামীতে আরো বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে সংগঠনটি।

ইত্তেফাক/এএএম