গল্প ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ‘শান্তি নিবাস

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৫

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার সৃজনশীল শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল বিনোদন জগতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছেন তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও নির্মাতা তানজিল আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান ব্রান্টা টেকের চলচ্চিত্র নির্মাণ উদ্যোগ ব্রান্টা ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত হয়েছে এআই-নির্ভর বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘শান্তি নিবাস’।

প্রচলিত শুটিং পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, সৃজনশীল পরিকল্পনা ও ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন কৌশল কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে গল্পনির্ভর এই সিরিজ।

শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা তুলে ধরা নয়, ভালোবাসা, হাস্যরস, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের আবেগ এবং তরুণ প্রজন্মের বাস্তব জীবনের গল্প নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তরুণ বয়স থেকেই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহী তানজিল আহমেদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রান্টা টেকের মাধ্যমে তিনি এআইভিত্তিক বিজ্ঞাপনচিত্র, ব্র্যান্ড ফিল্ম, ডিজিটাল কনটেন্ট, ব্র্যান্ডিং ও সফটওয়্যার প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন।

তানজিলের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। এর আগে নেটফ্লিক্সে প্রদর্শিত কাজ রয়েছে—এমন একজন পরিচালকের সঙ্গে সহযোগিতামূলক একটি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে চলচ্চিত্রে গল্প বলার কৌশল, দৃশ্য পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।

এবার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে সহযোগী হিসেবে নয়, বরং নিজের প্রতিষ্ঠান, নির্মাতা দল ও পরিচালনায় একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প দর্শকদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সেই উদ্যোগের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ‘শান্তি নিবাস’।

‘শান্তি নিবাস’ কেবল একটি আবাসিক ভবনের নাম নয়। এটি এমন একটি কাল্পনিক জগৎ, যেখানে একই ছাদের নিচে বসবাসকারী মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন, আবেগ, ভুল বোঝাবুঝি, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের গল্প একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

এই গল্পে রয়েছে হঠাৎ চোখাচোখি থেকে জন্ম নেওয়া ভালোবাসা, প্রতিবেশীদের মজার ঘটনা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং একসঙ্গে বসবাসের সৌন্দর্য।

পাশাপাশি বর্তমান সময়ের তরুণ উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম, নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন, ব্যর্থতা কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাণের সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়েছে।

কখনো হাস্যরস, কখনো আবেগ, আবার কখনো জীবনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে ‘শান্তি নিবাস’-এর গল্প। নির্মাতাদের লক্ষ্য, দর্শকেরা যেন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখার পাশাপাশি গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের পরিচিত জীবনের মিল খুঁজে পান।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও তৈরি করা আর ধারাবাহিক গল্প, চরিত্র ও আবেগের সামঞ্জস্য বজায় রেখে একটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। ‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণেও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তানজিল আহমেদ ও তাঁর সৃজনশীল দলকে।

প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে গবেষণা, দীর্ঘ পরিকল্পনা, বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অসংখ্য সৃজনশীল সিদ্ধান্ত।

চরিত্রের চেহারার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, একটি দৃশ্যের সঙ্গে পরবর্তী দৃশ্যের পরিবেশের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং মানুষের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ও আবেগ বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

কোনো দৃশ্য প্রত্যাশামতো না হলে সেটি সংশোধন, পুনর্নির্মাণ ও নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এভাবে গল্পের প্রতিটি অংশকে একটি সমন্বিত নির্মাণে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে দলটি।

গভীর রাত পর্যন্ত কাজ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা এবং সৃজনশীল সমাধান খোঁজার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে নির্মাণপ্রক্রিয়া। নির্মাতা দলের কাছে এটি শুধু একটি ওয়েব সিরিজ তৈরির কাজ নয়, বরং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে গল্প বলার একটি বাস্তব পরীক্ষা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও গল্প, পরিচালনা ও মানুষের সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প নয় বলে মনে করেন নির্মাতারা।

‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণে তাই শুধু আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরির পরিবর্তে চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক, আবেগ এবং গল্পের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নির্মাতাদের মতে, একটি দৃশ্য দেখতে সুন্দর হলেই তা ভালো চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না। সেই দৃশ্যের পেছনে থাকতে হয় গল্প, উদ্দেশ্য এবং দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সক্ষমতা। এই ধারণা থেকেই এআই প্রযুক্তিকে সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘শান্তি নিবাস’।

ইত্তেফাক/এএইচপি