সরকারি ক্রয়কাজে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা শর্তের বেড়াজালে বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা অংশ নিতে পারছে না। আবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারলেও অগ্রাধিকার তালিকায় সেই বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানরাই এগিয়ে থাকে।
সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় শুরু হয় ই-টেন্ডারিং। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধির দুর্বলতার কারণে সরকারের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ই-টেন্ডারের আইনি মারপ্যাঁচে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই ছোট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে কাজে অংশ নিচ্ছে। কয়েক হাত ঘুরে বাস্তবায়ন হওয়া উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে না। ফলে একই প্রকল্পে বারবার ডিপিপি সংশোধন হচ্ছে। বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়ও। আর একই প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পাওয়ায় সময়মতো শেষ হচ্ছে না প্রকল্প।
গত ১৪ নভেম্বর একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন, দরপত্র এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকাদার বা বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ না পায়। নতুন ঠিকাদার যাতে কাজ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গত বছরের সেপ্টেম্বরে জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স তাদের চলমান ১৭টি প্রকল্পের সব কটির কাজ বন্ধ করে দেয়। এর পরই টনক নড়তে শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। একই প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এতগুলো কাজ পেল কীভাবে সে প্রশ্ন দেখা দেয়। বাস্তবে ক্রয় আইনের দুর্বলতার কারণেই এধরনের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। একসঙ্গে এতগুলো কাজ বাস্তবায়ন করার মতো সামর্থ্য না থাকায় বাধ্য হয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে কাজের মান নিয়ে ওঠে প্রশ্ন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) কর্মকর্তারা বলেন, বার্ষিক লেনদেন (টার্নওভার) দেখে কাজ দেওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কাজ পাচ্ছে। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রেট শিডিউল হতে ১০ শতাংশের বেশি-কম রেটে টেন্ডার জমা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বেশির ভাগ সময় একই রেটে একাধিক টেন্ডার জমা পড়ে। এক্ষেত্রে যার টার্নওভার বেশি তাকেই কাজ দেওয়া হয়। তাছাড়া কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় বহু ঠিকাদার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না।
এমন আইনি দুর্বলতায় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোই কাজ পেয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো দপ্তর-সংস্থার কেনাকাটা পুরোপুরি ই-টেন্ডারিংয়ের আওতায় এখনো আসেনি। এক্ষেত্রে ঐ সংস্থা কেনাকাটার জন্য তাদের পছন্দসই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করছে। গুটিকয়েক ঠিকাদার শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর নয়, সরকারের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থায় কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ), শিক্ষা প্রকৌশল (ইইডি), স্বাস্থ্য প্রকৌশল (এইচইডি), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) অধিদপ্তর, বিদ্যুত্ উন্নয়ন ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব ঠিকাদার সবচেয়ে বেশি কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন।
সিপিটিইউ কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর জিকেজির ঘটনার পর বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান ও প্রকল্প পরিচালকদের নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করা হয়েছে। মূলত ক্রয় আইনের দুর্বলতাগুলো নিয়ে তারা মতামত দিয়েছেন। এর ভিত্তিতে ক্রয় আইনে কিছু সংশোধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইত্তেফাক/এসআই